বিশেষ প্রতিনিধি:
দেশের কৃষি খাতের সুরক্ষায় নিয়োজিত গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটে (এসআরডিআই) চরম দুর্নীতি, অর্থ লোপাট, নথিপত্র গায়েব এবং চাকরি বিধিমালা লঙ্ঘনের নজিরবিহীন অভিযোগ উঠেছে। বৈষম্যবিরোধী গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রতিষ্ঠানে সুশাসন ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার পরিবর্তে প্রধান কার্যালয়কে বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনের পুনর্বাসন কেন্দ্রে পরিণত করার অভিযোগ তুলেছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালক (ডিজি) ড. আফসার আলী ও তার অনুগত একটি বিশেষ সিন্ডিকেটের অশুভ আঁতাতে পুরো প্রশাসনিক ও গবেষণা কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে।
নথি গায়েব ও ভুয়া কেনাকাটায় কোটি কোটি টাকা লোপাট:
অনুসন্ধানে জানা যায়, কেন্দ্রীয় গবেষণাগারের অধীন ‘এক্রেডিটেশন ল্যাব’ (Accreditation Lab) প্রতিষ্ঠার নামে বড় ধরনের আর্থিক জালিয়াতি হয়েছে। তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ড. লুৎফর রহমান ও ড. হুমায়ুন কবির সিরাজী ‘মৃত্তিকা গবেষণা এবং গবেষণা সুবিধা জোরদারকরণ’ (এসআরএসআরএফ) প্রকল্পের পিডি ড. অব্দুল বারীর সঙ্গে যোগসাজশ করে ল্যাব স্থাপন ছাড়াই যন্ত্রপাতি কেনার নামে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন। কেনা যন্ত্রপাতির বড় অংশই অব্যবহৃত ও অকেজো হয়ে পড়ে আছে। এছাড়া এক ভারতীয় কনসালট্যান্টকে কোনো রিপোর্ট বা সনদ ছাড়াই প্রায় ৫৪ লাখ টাকা পরিশোধ করে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। ঢাকার বাইরে বদলির সময় দুর্নীতির আলামত নষ্ট করতে মূল ফাইল গায়েব করেন ড. সিরাজী, যা সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী ফৌজদারি অপরাধ। গত বছরের ১৯শে অক্টোবর ফাইল গায়েবের ঘটনায় সিএসও মো. জয়নাল আবেদীন তাঁকে শোকজ করলেও রহস্যজনক কারণে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উল্টো ডিজি আফসার আলী শাস্তির বদলে সিরাজীকে সয়েল কেমিস্ট্রি ও মাইক্রোবায়োলজি ল্যাবের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে এনে পুরস্কৃত করেছেন।
পরিকল্পনা সেল ভেঙে দলীয়করণ:
ইনস্টিটিউটের উন্নয়ন কর্মসূচি প্রণয়নকারী ‘পরিকল্পনা সেল’ সুকৌশলে ভেঙে দিয়ে সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ডিপিডি কমিটি থেকে যোগ্য ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের অপসারণ করে বিগত সরকারের অনুগত কর্মকর্তাদের নতুন করে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
৯ম গ্রেডের কর্মকর্তার ‘পাজেরো রাজত্ব’:
পাবলিকেশন অ্যান্ড লিয়াজোঁ অফিসার (৯ম গ্রেড) শরিফুল ইসলামের বিরুদ্ধে ক্ষমতার ব্যাপক অপব্যবহারের তথ্য মিলেছে। বিধিমালা অনুযায়ী উপ-পরিচালক (প্রশাসন) হওয়ার যোগ্যতা (সহকারী পরিচালক হিসেবে ৭ বছরের অভিজ্ঞতা) না থাকা সত্ত্বেও ৬ষ্ঠ গ্রেডের একজন জ্যেষ্ঠ নারী কর্মকর্তাকে অব্যাহতি দিয়ে শরিফুলকে এই চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রটোকল ভেঙে তিনি ব্যবহার করছেন বিলাসবহুল সরকারি পাজেরো গাড়ি (ঢাকা মেট্রো ঘ-১৩-৭৮৪৬)। উল্লেখ্য, তাঁর ছেলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হামলার মামলায় (মোহাম্মদপুর থানা মামলা নং-৫৮, তারিখ: ১৭/৫/২৬) গ্রেপ্তার হয়ে জেলহাজতে থাকলেও শরিফুল নিজেকে বিরোধী মতাদর্শী দাবি করে ডিজির প্রধান আস্থাভাজন হিসেবে সব কমিটির সদস্য সচিব পদ দখল করে আছেন।
গাড়ি বিলাস ও হয়রানিমূলক বদলি:
ডিজি আফসার আলী দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে সৎ কর্মকর্তাদের প্রাতিষ্ঠানিক গাড়ি সুবিধা বন্ধ করে দিলেও তিনি ও তাঁর পরিবার এককভাবে ৩টি সরকারি গাড়ি ব্যবহার করছেন। নিয়মবহির্ভূতভাবে সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক কার্যালয়ের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (৪র্থ গ্রেড) মো. আমিনুল ইসলামকে ঢাকায় ন্যস্ত করার পাশাপাশি অহেতুক স্ট্যান্ড রিলিজ ও দূরবর্তী স্থানে বদলি করে পুরো প্রতিষ্ঠানে আতঙ্ক তৈরি করা হয়েছে।
৬৩ কর্মচারীর চাকরি অনিশ্চিত, টেন্ডার বাণিজ্যের পাঁচতারা
কারিগরি রিপোর্ট প্রকাশ কমিটিতে বিতর্কিত কর্মকর্তা আমীর মো. জাহিদকে প্রধান করা এবং কোনো পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়া ৬৩ জন আউটসোর্সিং কর্মীর ২ বছর মেয়াদি চুক্তি বাতিল করায় ল্যাব ও মাঠ জরিপের কাজ স্থবির হয়ে পড়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘কৃষিবিদ সিকিউরিটি সার্ভিস লি:’-এর চুক্তি হঠাৎ বাতিল করে নতুন টেন্ডার আহ্বান না করায় তিন মাস ধরে বেতন না পেয়ে মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন কর্মচারীরা। অভিযোগ রয়েছে, পছন্দের নতুন কোম্পানিকে কাজ পাইয়ে দিতেই ডিজি এই কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছেন।
আইন আদালত উপেক্ষা করে পদোন্নতি:
নিয়োগ ও পদোন্নতিসংক্রান্ত মামলার (সিপিএলএ ৫০৯৮/২০২৫ এবং ১৭৯৩৫/২০২৫) বিপরীতে মহামান্য আপিল বিভাগের লিভ টু আপিল ও রুল বিচারাধীন থাকা সত্ত্বেও সব আইনকানুন বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ৮ জন নন-ক্যাডার ও ১২ জন ক্যাডার কর্মকর্তাকে দ্রুত পদোন্নতি দেওয়ার তোড়জোড় চালাচ্ছে এই সিন্ডিকেট।
এ বিষয়ে মতামত জানতে আফসার আলীর সাথে তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি তার কার্যালয়ে দেখা করতে বলেন অথবা কাউকে পঠাতে বলেন। অন্যদিকে এবিষয়ে হুমায়ুন কবির সিরাজীর কাছে মতামত জানতে চাইলে তিনি বলেন, এসব একশ ভাগ মিথ্যা। একটি সিন্ডিকেট আমাদের বিরুদ্ধে ভুল তথ্য দিয়ে এসব করছে।