বৃহস্পতিবার, আগস্ট ২০, ২০২৬
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
শিরোনাম :

   জাতীয়
নিরাপত্তা ও পর্যটনের ভবিষ্যৎ রক্ষায় কক্সবাজারকে মানব পাচার ও অপরাধমুক্ত করতে হবে
  Date : 20-08-2026
Share Button

কক্সবাজার শুধু বাংলাদেশের প্রধান পর্যটনকেন্দ্র নয়; এটি দেশের আন্তর্জাতিক পর্যটন-পরিচয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের সমুদ্র, প্রকৃতি ও পর্যটন সম্ভাবনার বড় অংশই কক্সবাজারকে ঘিরে। তাই এই এলাকার নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা ও সামাজিক স্থিতিশীলতা কেবল স্থানীয় বিষয় নয়—এটি জাতীয় স্বার্থের বিষয়।

পর্যটন মূলত আস্থার অর্থনীতি। একজন দেশি বা বিদেশি পর্যটক কক্সবাজারে যাওয়ার আগে জানতে চান—তিনি সেখানে কতটা নিরাপদ? সমুদ্রসৈকত, হোটেল, যাতায়াত, রাতের পরিবেশ এবং সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কেমন? এসব প্রশ্নের উত্তর যদি নেতিবাচক হয়, তাহলে পর্যটক কমবে, বিনিয়োগ কমবে, ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং স্থানীয় মানুষের আয়ও কমে যাবে।

এই বাস্তবতায় কক্সবাজারকে ঘিরে মানব পাচার, মাদক, অস্ত্র, অপহরণসহ সংঘবদ্ধ অপরাধের যেকোনো নেটওয়ার্ককে শুধু বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এগুলোকে দেখতে হবে জাতীয় নিরাপত্তা, মানবাধিকার, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং পর্যটন সুরক্ষার সমন্বিত সংকট হিসেবে।

বিশেষ করে মানব পাচারের ক্ষেত্রে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। শুধু একজন দালালকে গ্রেপ্তার করলেই পাচার বন্ধ হবে না। কোথা থেকে মানুষ সংগ্রহ করা হচ্ছে, কারা তাদের প্রলুব্ধ করছে, কোথায় জড়ো করা হচ্ছে, কারা পরিবহন করছে, কোন সমুদ্রপথ ব্যবহার করা হচ্ছে, অর্থের লেনদেন কোথায় হচ্ছে এবং দেশের বাইরে কারা এই নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছে—পুরো চেইনটি চিহ্নিত করতে হবে। প্রয়োজন একটি পূর্ণাঙ্গ মানব পাচার নেটওয়ার্ক ম্যাপিং। অর্থাৎ মানব পাচারের পুরো নেটওয়ার্কের মানচিত্র তৈরি করতে হবে—মানুষ সংগ্রহ থেকে শুরু করে দালাল, পরিবহন, নৌপথ, অর্থের উৎস এবং আন্তর্জাতিক গন্তব্য পর্যন্ত।

এখানে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বিষয়টিও অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে দেখতে হবে। পুরো রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে কোনোভাবেই অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে না। বাস্তবতা হলো, তাদের বড় একটি অংশ নিজেরাই বাস্তুচ্যুতি, দারিদ্র্য ও নিরাপত্তাহীনতার শিকার। কিন্তু একই সঙ্গে যদি কোনো সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র রোহিঙ্গা ক্যাম্প বা এর আশপাশের দুর্বলতাকে ব্যবহার করে মানব পাচার, মাদক, অস্ত্র, অপহরণ কিংবা অন্যান্য অপরাধ পরিচালনা করে থাকে, তাহলে সেই নেটওয়ার্ককে কঠোরভাবে শনাক্ত ও দমন করতে হবে।

মূল প্রশ্ন তাই ‘রোহিঙ্গারা অপরাধী কি না’—এটি নয়। মূল প্রশ্ন হলো—কারা এই দুর্বল জনগোষ্ঠীকে ব্যবহার করছে, কারা অর্থ দিচ্ছে, কারা স্থানীয়ভাবে সহযোগিতা করছে এবং কারা সীমান্তের ওপারে এই অপরাধী চ্যানেল পরিচালনা করছে? শুধু নিম্নপর্যায়ের দালাল ধরে সাফল্য দেখালে চলবে না। মূল হোতা, অর্থদাতা, সংগঠক এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগকারীদের শনাক্ত করতে হবে। পাচারকারীদের অর্থের উৎস ও গন্তব্য অনুসরণ করতে হবে। ব্যাংকিং লেনদেন, সম্পদের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, নৌযান ও পরিবহন ব্যবস্থার ব্যবহার—সবকিছু তদন্তের আওতায় আনতে হবে। কারণ একটি শক্তিশালী অপরাধী নেটওয়ার্ককে ভাঙতে হলে তার মানুষের চেইন যেমন ভাঙতে হবে, তেমনি অর্থের চেইনও ভাঙতে হবে।

একই সঙ্গে কক্সবাজারের সমুদ্র ও উপকূলীয় এলাকায় সমন্বিত নজরদারি আরও শক্তিশালী করা জরুরি। প্রশাসন, পুলিশ, কোস্ট গার্ড, গোয়েন্দা সংস্থা এবং সীমান্ত-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে দ্রুত ও কার্যকর তথ্য বিনিময় থাকতে হবে। থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়াসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে আন্তঃদেশীয় অপরাধবিরোধী তথ্য বিনিময় ও সমন্বিত তদন্তও জোরদার করতে হবে।
কারণ অপরাধীরা যদি সীমান্ত পেরিয়ে নেটওয়ার্ক তৈরি করতে পারে, রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগও শুধু সীমান্তের মধ্যে আটকে থাকতে পারে না।সবচেয়ে বড় কথা, কক্সবাজারকে অপরাধের করিডোর হতে দেওয়া যাবে না।

একটি আন্তর্জাতিক পর্যটনকেন্দ্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ শুধু তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নয়—নিরাপত্তা ও আস্থা। কক্সবাজারের ওপর দেশি-বিদেশি পর্যটকের আস্থা নষ্ট হলে এর প্রভাব পড়বে হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, ক্ষুদ্র ব্যবসা, স্থানীয় কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক পর্যটন অর্থনীতিতে। তাই এখন প্রয়োজন বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়; প্রয়োজন পুরো অপরাধী নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়ার সমন্বিত রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ।

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে নয়—অপরাধীকে চিহ্নিত করতে হবে। দালালকে নয়—নেটওয়ার্কের মূল হোতাকে ধরতে হবে। শুধু সীমান্ত পাহারা নয়—সীমান্তপারের অপরাধী চ্যানেলও ভাঙতে হবে। এবং কোনোভাবেই কক্সবাজারের নিরাপত্তা ও পর্যটনের আস্থাকে অপরাধীদের হাতে ছেড়ে দেওয়া যাবে না। কারণ কক্সবাজারের নিরাপত্তা মানেই বাংলাদেশের পর্যটনের নিরাপত্তা।

লেখক একজন বিশিষ্ট কলামিস্ট, গবেষk, নীতি বিশ্লেষক ও উন্নয়নকর্মী



  
  সর্বশেষ
নিরাপত্তা ও পর্যটনের ভবিষ্যৎ রক্ষায় কক্সবাজারকে মানব পাচার ও অপরাধমুক্ত করতে হবে
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে ফের সিন্ডিকেটের শঙ্কা
বন্ড সুবিধার আড়ালে ‘হোয়াইট কলার ক্রাইম’
খুলনা গনপূর্তের অতিরিক্ত প্রকৌশলী সাইফুরের শতকোটি টাকার অঢেল সম্পদ; প্রশ্নবিদ্ধ প্রশাসন

প্রধান সম্পাদক: মতিউর রহমান , সম্পাদক: জাকির হোসেন, নির্বাহী সম্পাদক এসএম আবুল হাসান। সম্পাদক কর্তৃক ২ আরকে মিশন রোড, ঢাকা ১২০৩ থেকে প্রকাশিত এবং বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস ২০১৯ ফকিরাপুল , ঢাকা ১০০০ থেকে মুদ্রিত। বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: জামান টাওয়ার (৪র্থ তলা) ৩৭/২ পুরাণা পল্টন, ঢাকা ১০০০
ফোন: ০১৫৫৮০১১২৭৫, ০১৭১১১৪৫৮৯৮, ০১৭২৭২০৮১৩৮। ই-মেইল: bortomandin@gmail.com, ওয়েবসাইট: bortomandin.com