দেশের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যম `দৈনিক বর্তমানদিন` দীর্ঘদিন ধরে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধার অপব্যবহার, শুল্ক ফাঁকি ও সংশ্লিষ্ট অনিয়ম নিয়ে অনুসন্ধান চালিয়ে আসছে। নথিপত্র, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য এবং বিভিন্ন ঘটনার তথ্য বিশ্লেষণে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক চিত্র
আইন ও সমাজের দৃষ্টিতে ‘ক্রাইম’ বলতে সাধারণত এমন কর্মকাণ্ডকে বোঝায়, যা প্রচলিত আইন লঙ্ঘন করে এবং যার জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে। খুন, ডাকাতি, ছিনতাই কিংবা সহিংস অপরাধের মতো অপরাধে ক্ষতির চিত্র সাধারণত দৃশ্যমান। কিন্তু অপরাধের আরেকটি ধরন আছে, যেখানে সরাসরি রক্তপাত বা প্রাণহানি না ঘটলেও রাষ্ট্র, অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের ওপর এর প্রভাব হতে পারে ব্যাপক ও দীর্ঘস্থায়ী।
সমাজের উচ্চপদস্থ ব্যক্তি, ব্যবসায়ী, করপোরেট প্রতিষ্ঠান কিংবা প্রভাবশালী কোনো গোষ্ঠীর আর্থিক প্রতারণা, কর ফাঁকি, অর্থ আত্মসাৎ, জালিয়াতি বা অর্থপাচারের মতো অপরাধকে এই কারণেই বলা হয় ‘হোয়াইট কলার ক্রাইম’।
শিল্পোন্নয়নের শুরু থেকেই সিকিউরিটিজ জালিয়াতি, করপোরেট প্রতারণা, অর্থ আত্মসাৎ, শুল্ক ফাঁকি, বাজার কারসাজি, ‘পাম্প অ্যান্ড ডাম্প’ এবং মানি লন্ডারিংয়ের মতো অপরাধ বিভিন্ন দেশে অর্থনৈতিক ব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে এসেছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়।
দেশে এমন অপরাধের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধার অপব্যবহার। রপ্তানিমুখী শিল্পকে প্রতিযোগিতামূলক রাখতে সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, তার আওতায় শুল্ক-কর ছাড়াই কাঁচামাল আমদানির সুযোগ পায় নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, একটি অসাধু ব্যবসায়ী চক্র সেই সুবিধাকে ব্যবহার করছে খোলাবাজারে পণ্য বিক্রি, ভুয়া রপ্তানি, অতিরিক্ত পণ্য আমদানি এবং রাজস্ব ফাঁকির কাজে। এর সঙ্গে কাস্টমস ও রাজস্ব বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশের অভিযোগও রয়েছে।
দেশের অনুসন্ধানী গণমাধ্যম `দৈনিক বর্তমানদিন` দীর্ঘদিন ধরে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধার অপব্যবহার, শুল্ক ফাঁকি ও সংশ্লিষ্ট অনিয়ম নিয়ে অনুসন্ধান চালিয়ে আসছে। নথিপত্র, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য এবং বিভিন্ন ঘটনার তথ্য বিশ্লেষণে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক চিত্র।
বন্ড সুবিধা: সুযোগ, নাকি অপব্যবহারের হাতিয়ার?
বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধার মূল উদ্দেশ্য রপ্তানিমুখী শিল্পকে সহায়তা করা। এ সুবিধার আওতায় অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট শর্তে শুল্ক ও কর পরিশোধ ছাড়াই কাঁচামাল আমদানি করতে পারে। আমদানি করা এসব কাঁচামাল নির্ধারিত ওয়্যারহাউসে সংরক্ষণ করে তা দিয়ে পণ্য উৎপাদন এবং পরে রপ্তানি করার কথা।
নিয়ম অনুযায়ী, কাস্টমসের অনুমতি এবং প্রযোজ্য শুল্ক-কর পরিশোধ ছাড়া এসব কাঁচামাল বা উৎপাদিত পণ্য স্থানীয় বাজারে বিক্রির সুযোগ নেই।
কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, বাস্তবে বন্ড সুবিধায় আমদানি করা কাঁচামালের একটি অংশ রপ্তানি পণ্য তৈরিতে ব্যবহার না করে খোলাবাজারে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে।
কোনো প্রতিষ্ঠান শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমদানি করা পণ্য স্থানীয় বাজারে বিক্রি করলে পণ্যভেদে প্রায় ৮৯ শতাংশ থেকে ১৫৯ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক ও কর পরিশোধ করতে হয়। ফলে পণ্য স্থানীয় বাজারে বিক্রি করেও যদি কাগজে-কলমে রপ্তানি দেখানো যায়, তাহলে একদিকে শুল্ক-কর এড়ানো সম্ভব হয়, অন্যদিকে কিছু ক্ষেত্রে রপ্তানি প্রণোদনা পাওয়ার সুযোগও তৈরি হয়।
এ ধরনের ব্যবস্থার অপব্যবহার শুধু সরকারের রাজস্ব ক্ষতি করে না; এটি বৈধ ব্যবসায়ীদের জন্য অসম প্রতিযোগিতা তৈরি করে এবং দেশের সামগ্রিক বাণিজ্য ব্যবস্থার ওপর আস্থার সংকট তৈরি করে।
নজরদারির ঘাটতি, নাকি যোগসাজশ?
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বন্ড সুবিধাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৯ হাজার। এর অর্ধেকের বেশি তৈরি পোশাক খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের আওতায় থাকা প্রায় ৬ হাজার প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রায় ৪ হাজারই গার্মেন্টস বন্ড।
এত বিপুলসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়মিত তদারকি করা কাস্টমস কর্তৃপক্ষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। জনবল সংকটকে এ ক্ষেত্রে অন্যতম সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
তবে অনুসন্ধানে উঠে আসা বিভিন্ন ঘটনার সঙ্গে শুধু জনবল সংকটের বিষয়টি জড়িত নয় বলে অভিযোগ রয়েছে। নথিপত্রে অসঙ্গতি, পণ্যের ওজনে গরমিল, মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে পণ্য আমদানি, কনটেইনার যথাযথভাবে যাচাই না করে পণ্য খালাস এবং ঘুষের বিনিময়ে নিয়মবহির্ভূত সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে কাস্টমস ও রাজস্ব কর্মকর্তাদের একটি অংশের বিরুদ্ধে।
অন্যদিকে, কিছু ক্ষেত্রে পণ্য খালাসের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর ও সিল জাল করে পণ্য ছাড়িয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধেও।
নিচের কয়েকটি ঘটনা এই ব্যবস্থার দুর্বলতা ও সম্ভাব্য অপব্যবহারের চিত্র স্পষ্ট করে।
কেস স্টাডি–১: সাত প্রতিষ্ঠানের ২৪ কোটি টাকার ‘ভুয়া রপ্তানি’
দেশের রপ্তানি খাতে নতুন করে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে অন্তত ২৯টি চালান রপ্তানি হিসেবে নথিভুক্ত হলেও বাস্তবে সেগুলোর কোনো পণ্য নির্ধারিত ডিপো বা বন্দরে পৌঁছায়নি বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। চালানগুলোর ঘোষিত মূল্য প্রায় ২৪ কোটি টাকা।
নথিপত্র অনুযায়ী, এসব চালান ইতালি, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রিয়া, সুইডেন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও হংকংয়ে পাঠানোর কথা ছিল। কিন্তু কাস্টমস নথিতে রপ্তানি সম্পন্ন দেখানো হলেও বাস্তবে কারখানা থেকে সংশ্লিষ্ট ডিপো পর্যন্ত পণ্য যাওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
যে ২৯টি চালান এখন পর্যন্ত যাচাই করা হয়েছে, সেগুলো অন্তত সাতটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো - আরটি ফ্যাশন, এইচবিএস অ্যাপারেলস, আল গালেব ফ্যাশন লিমিটেড, ডিলাক্স অ্যাপারেলস লিমিটেড, এনএম ফ্যাশন, এনএম নিট ফ্যাশন এবং ভূঁইয়া ফেব্রিকস লিমিটেড।
চালানগুলোর খালাস ও পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত ছিল শাহজালাল এন্টারপ্রাইজ, আলফা টেক্সটাইল লিমিটেড এবং বাংলাদেশ শিপিং এজেন্সি। পণ্য সংশ্লিষ্ট ডিপো হিসেবে নথিতে ছিল সামিট অ্যালায়েন্স পোর্ট লিমিটেড ও পোর্ট লিংক লজিস্টিকস সেন্টার লিমিটেড।
কাস্টমস-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, শনাক্ত হওয়া ২৯টি চালানই পুরো চিত্র নয়। একই পদ্ধতিতে আরও কোনো চালান রপ্তানি হিসেবে দেখানো হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ভুয়া রপ্তানির আড়ালে অর্থপাচারের শঙ্কা
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, কথিত ভুয়া রপ্তানির সঙ্গে আমদানি পণ্যের মূল্য অতিরঞ্জিত করে বিদেশে অর্থ পাঠানোর ঘটনাও যুক্ত থাকতে পারে। তাদের আশঙ্কা, আমদানির সময় পণ্যের মূল্য বাড়িয়ে দেখিয়ে বিদেশে অতিরিক্ত অর্থ পাঠানোর পর কাল্পনিক রপ্তানির মাধ্যমে সেই অর্থের লেনদেনকে বৈধতার আবরণ দেওয়ার চেষ্টা হয়ে থাকতে পারে।
এই ধরনের কর্মকাণ্ড প্রমাণিত হলে তা অর্থপাচার প্রতিরোধ আইনের আওতায় অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। একজন তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা মনে করেন, এখন পর্যন্ত শনাক্ত ঘটনাগুলো হয়তো একটি বড় চক্রের সামান্য অংশমাত্র।
কেস স্টাডি–২: আরটি ফ্যাশনের ৮৪ লাখ টাকার ‘রপ্তানি’
নারায়ণগঞ্জের পোশাক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান আরটি ফ্যাশন গত ২৪ মে প্রায় ৮৪ লাখ টাকা মূল্যের পোশাক রপ্তানির ঘোষণা দেয়।
প্রতিষ্ঠানের পক্ষে পণ্য খালাস ও পরিবহনের দায়িত্বে থাকা এজেন্ট রপ্তানি ঘোষণা জমা দিলে তা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অনলাইন শুল্ক ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থায় নথিভুক্ত হয়। ঘোষণায় পণ্যের মোট ওজন দেখানো হয় ২৩ হাজার ৯৯২ কেজি।
নিয়ম অনুযায়ী, ঘোষিত পণ্য প্রথমে নির্ধারিত অভ্যন্তরীণ কনটেইনার ডিপোতে যাওয়ার কথা। সেখানে কাস্টমস কর্মকর্তারা পণ্য পরীক্ষা, কাগজপত্র যাচাই ও মূল্যায়নের পর পণ্য চট্টগ্রাম বন্দরে পাঠানোর কথা। এরপর জাহাজে পণ্য ওঠার মাধ্যমে রপ্তানি সম্পন্ন হওয়ার কথা।
কিন্তু আরটি ফ্যাশনের চালানের ক্ষেত্রে কাগজপত্রে রপ্তানির প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেও বাস্তবে পণ্য নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছায়নি বলে সংশ্লিষ্ট নথি ও কর্মকর্তাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।
আরও একটি বিষয় কর্মকর্তাদের নজরে আসে। রপ্তানি ঘোষণায় পণ্যের মোট ওজন এবং প্যাকেটসহ মোট ওজন একই দেখানো হয়েছিল। সাধারণত প্যাকেট ও মোড়কের ওজন যুক্ত হওয়ার কারণে নিট ও মোট ওজনের মধ্যে পার্থক্য থাকার কথা।
সন্দেহ তৈরি হওয়ার পর কর্মকর্তারা মূল মূল্যায়ন নথি দেখতে চান। কিন্তু ঈদের ছুটি এবং জাহাজে পণ্য ওঠানোর নির্ধারিত সময়সীমার সুযোগ নেওয়া হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিযোগ।
এরপর ২৬ মে জাল সিল ও স্বাক্ষর ব্যবহার করে চালানটি খালাস করা হয়েছে বলে নথিতে দেখানো হয়। সেখানে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা জান্নাতুল জান্নাত ইভিসহ আরও তিন কাস্টমস কর্মকর্তার স্বাক্ষর ও সিল ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।
জান্নাতুল জান্নাত ইভি জানান, আরটি ফ্যাশনের চালানসহ অন্তত চারটি চালানে তাঁর এবং অন্য কর্মকর্তাদের সিল ও স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে।
চট্টগ্রামের সংশ্লিষ্ট অভ্যন্তরীণ কনটেইনার ডিপোর এক কর্মকর্তা জানান, জনবল সংকটের সুযোগ নিয়ে প্রতারকরা পণ্য ওঠানোর শেষ দিনে কাগজপত্র জমা দিয়ে থাকতে পারে। ওই সময় দ্রুত কাজ শেষ করার চাপ থাকায় জালিয়াতির সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে তাঁর ধারণা।
সরকারি নথি ও সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জের কারখানা থেকে ঘোষিত পণ্য নির্ধারিত ডিপো বা চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানোর প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তারপরও চালানটি রপ্তানি হিসেবে নথিভুক্ত হয়।
কেস স্টাডি–৩: আমদানির অনুমতি ১১৩ টন, আমদানি ১,১১৩ টন
বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের অভিযোগে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের আট কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করার ঘটনা এই ব্যবস্থার আরেকটি উদ্বেগজনক দিক সামনে আনে।
অভিযোগ ছিল, কনটেইনারপ্রতি ঘুষের বিনিময়ে প্রাপ্যতার বাইরে বিপুল পরিমাণ কাপড় খালাসে সহযোগিতা করা হয়েছে। এতে সরকারের বিপুল রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে বলে তদন্তে উঠে আসে।

ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠান হিসেবে উঠে আসে এনএইচ অ্যাপারেলস লিমিটেড।
প্রতিষ্ঠানটির বন্ড সুবিধায় আমদানির অনুমতি ছিল প্রায় ১১৩ টন কাপড়ের। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি আমদানি করে প্রায় ১ হাজার ১১৩ টন কাপড়। এর মধ্যে অনুমোদিত সীমার বাইরে প্রায় ৮২১ টন কাপড় খালাস নেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের মে পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি ৯১টি বিল অব এন্ট্রি দাখিল করে। এর মধ্যে ৭৪টি বিল অব এন্ট্রির মাধ্যমে প্রাপ্যতার বাইরে ৮ লাখ ২০ হাজার কেজির বেশি কাপড় খালাস দেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্ট তদন্তে উঠে আসে।
এই ঘটনায় তৎকালীন সাবটিম-১৪-এর দায়িত্বে থাকা দুই রাজস্ব কর্মকর্তা ও ছয় সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, তাঁরা কাগজপত্র যথাযথভাবে যাচাই না করে কনটেইনারপ্রতি ২ লাখ টাকা করে ঘুষের বিনিময়ে পণ্য খালাসে সহযোগিতা করেন।
বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তারা হলেন—রাজস্ব কর্মকর্তা মো. মজিদুল হক, রাজস্ব কর্মকর্তা মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মো. আবু রায়হান সিদ্দিকী, সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মো. রেজওয়ান উল কবীর, সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মো. সাইফুদ্দিন, সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মো. রুবেল আলম, সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হালিমা সাদিহা রিতা এবং সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা আতিক উল্লাহ।
এই ঘটনায় `দৈনিক বর্তমানদিন` এর তৎকালীন অনুসন্ধানেও কাস্টমস কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠে আসে।
কেস স্টাডি–৪: জাদিদ অ্যাপারেলসের ১০৮ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ
বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করে শত কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগে চট্টগ্রামের জাদিদ অ্যাপারেলস লিমিটেডের বন্ড লাইসেন্স বাতিলের সুপারিশ করেছে চট্টগ্রাম কাস্টমস অ্যান্ড বন্ড কমিশনারেট।

তদন্তে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বন্ড সুবিধায় শুল্কমুক্তভাবে আমদানি করা কাপড় অবৈধভাবে খোলাবাজারে বিক্রির মাধ্যমে প্রায় ১০৮ কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকির প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। অভিযোগের শুরুতে রাজস্ব ফাঁকির পরিমাণ প্রায় ২৬০ কোটি টাকা বলে উল্লেখ করা হলেও তদন্ত শেষে প্রাথমিকভাবে প্রায় ১০৮ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির তথ্য পাওয়া যায়।
অভিযোগের ভিত্তিতে ২০২৫ সালে জাদিদ অ্যাপারেলসের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম, উৎপাদন সক্ষমতা এবং বন্ড সুবিধার ব্যবহার সরেজমিনে যাচাই করে চট্টগ্রাম কাস্টমস অ্যান্ড বন্ড কমিশনারেট। দীর্ঘ তদন্ত শেষে চলতি বছরের মার্চে প্রকাশিত প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বন্ড লাইসেন্স বাতিলের সুপারিশ করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এই বিষয়ে বক্তব্য জানতে জাদিদ অ্যাপারেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মোজাম্মেল হকের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বা প্রতিষ্ঠানের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
কেস স্টাডি-৫: কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, ঢাকা (দক্ষিণ)-এ গ্রাহক হয়রানি চরমে
কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, ঢাকা (দক্ষিণ)-এর ২ কর্মকর্তা ও ১ বহিরাগত ব্যক্তির বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, ফাইল নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রিতা এবং ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে অর্থ আদায়ের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে। সেবাগ্রহীতাদের দাবি, একটি প্রভাবশালী চক্রের মাধ্যমে বিভিন্ন ফাইল নিষ্পত্তি ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করা হচ্ছে, যার ফলে ভোগান্তিতে পড়ছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা।
সম্প্রতি, এই বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একটি অভিযোগ জমা পড়েছে। একাধিক সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের উচ্চমান সহকারী ও বর্তমানে কমিশনারের ব্যক্তিগত সহকারী (পিএ) টুটুল সরকার, কম্পিউটার অপারেটর আব্দুল্লাহ আল যুবায়ের এবং বহিরাগত ব্যক্তি মো. আজগর আলী সিন্ডিকেট করে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি করছেন। মূলত বহিরাগত মো. আজগর আলীকে ব্যবহার করে এই চক্রটি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যোগাযোগ স্থাপন এবং ঘুষের লেনদেন পরিচালনা করছে।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, বর্তমানে কমিশনারের ব্যক্তিগত সহকারী (পিএ) হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী টুটুল সরকারের নির্দেশনায় বিভিন্ন ফাইলের কার্যক্রম পরিচালিত হয়। একই সঙ্গে কম্পিউটার অপারেটর আব্দুল্লাহ আল যুবায়ের এবং বহিরাগত মোঃ আজগর আলীও সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ায় ভূমিকা পালন করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ভুক্তভোগীদের দাবি, অফিসজুড়ে একটি অঘোষিত প্রভাববলয় গড়ে উঠেছে, যার মাধ্যমে বিভিন্ন সেবা কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করা হয়। বর্তমানে আব্দুল্লাহ আল যুবায়ের বন্ড সার্কেল ৩০-৩১ এবং জনপ্রশাসন শাখার দায়িত্বে রয়েছেন। এসব সার্কেলের আওতায় দেশের প্রায় ৩০৬টি বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন প্রতিনিধি অভিযোগ করেন, কোনো সেবা নিতে আব্দুল্লাহ আল যুবায়েরের কাছে গেলে তিনি মোঃ আজগর আলীর মাধ্যমে টুটুল সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। এরপর ফাইল নিষ্পত্তি সংক্রান্ত বিষয়ে আর্থিক লেনদেনের প্রস্তাব দেওয়া হয় বলে তারা দাবি করেন। অভিযোগকারীদের মতে, নির্ধারিত অর্থ প্রদান করা হলে ফাইল দ্রুত নিষ্পত্তি করা হয়, অন্যথায় বিভিন্ন জটিলতা ও বিলম্বের সম্মুখীন হতে হয়।
শুধু রাজস্ব ক্ষতি নয়, ঝুঁকিতে পুরো অর্থনীতি
বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের প্রভাব শুধু সরকারের রাজস্ব আদায়ে সীমাবদ্ধ নয়। শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমদানি করা কাঁচামাল যদি রপ্তানির পরিবর্তে স্থানীয় বাজারে বিক্রি হয়, তাহলে বৈধ ব্যবসায়ীরা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়েন। কারণ একজন বৈধ আমদানিকারককে যেখানে শুল্ক-কর পরিশোধ করতে হয়, সেখানে বন্ড সুবিধার অপব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠান একই পণ্য তুলনামূলক কম খরচে বাজারে ছাড়তে পারে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় স্থানীয় টেক্সটাইল ও উৎপাদনশিল্প। একই সঙ্গে সরকারের রাজস্ব কমে যায় এবং বাজারে অবৈধ পণ্যের সরবরাহ বাড়ে।
এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যদি ভুয়া রপ্তানি, মিথ্যা ঘোষণা কিংবা অতিরিক্ত মূল্য দেখিয়ে বিদেশে অর্থ স্থানান্তরের ঘটনা যুক্ত হয়, তাহলে বিষয়টি কেবল শুল্ক ফাঁকির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা অর্থপাচার ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থার অপব্যবহারের মতো গুরুতর অভিযোগের দিকে গড়াতে পারে।
৫ বিলিয়ন ডলারের অনানুষ্ঠানিক বাজার?
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্যের বরাত দিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে বলা হচ্ছে, বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধার অপব্যবহার ও চোরাচালানের মাধ্যমে প্রতিবছর প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলারের কাপড়, পোশাক ও অ্যাক্সেসরিজ দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে প্রবেশ করছে। এই পরিমাণের দাবিটি স্বাধীনভাবে পূর্ণাঙ্গভাবে যাচাই করা জরুরি হলেও, এর মাধ্যমে সমস্যাটির সম্ভাব্য ব্যাপকতা সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া যায়।
কারণ বন্ড সুবিধার মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের রপ্তানি শিল্পকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক করে তোলা। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পের বিকাশে এ সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু একটি সুবিধা যখন নিয়ন্ত্রণহীনতার সুযোগে অবৈধ ব্যবসার হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন সেটি একদিকে রাষ্ট্রের রাজস্ব ক্ষতি করে, অন্যদিকে বৈধ ব্যবসা ও শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা দুর্বল করে।
দায় কার?
বন্ডেড ওয়্যারহাউস ব্যবস্থায় অনিয়মের ক্ষেত্রে সাধারণত দায় একক কোনো পক্ষের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। একদিকে রয়েছে এমন ব্যবসায়ী বা প্রতিষ্ঠান, যারা নিয়মের সুযোগ নিয়ে বা নিয়ম ভেঙে শুল্কমুক্ত পণ্য স্থানীয় বাজারে বিক্রি করার অভিযোগে অভিযুক্ত। অন্যদিকে রয়েছে তদারকি ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা সরকারি প্রতিষ্ঠান।
যদি জনবল সংকট থাকে, তবে সেটি প্রশাসনিক দুর্বলতা। কিন্তু সেই সংকটকে কাজে লাগিয়ে যদি কেউ ঘুষের বিনিময়ে পণ্য খালাস করে, নথি জাল করে কিংবা মিথ্যা রপ্তানি দেখায়, তাহলে সেটি আর কেবল প্রশাসনিক দুর্বলতা থাকে না—তা সম্ভাব্য অপরাধে পরিণত হয়।
আর যদি ব্যবসায়ী ও সরকারি কর্মকর্তাদের একটি অংশের মধ্যে যোগসাজশের অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে এটি একটি সংঘবদ্ধ হোয়াইট কলার ক্রাইম নেটওয়ার্ক হিসেবে তদন্তের দাবি রাখে।
প্রয়োজন কঠোর ডিজিটাল নজরদারি
বন্ড সুবিধার অপব্যবহার বন্ধ করতে শুধু নিয়ম জারি বা লাইসেন্স বাতিল যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন পুরো প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর করা।
একই সঙ্গে—আমদানি ও রপ্তানি তথ্যের স্বয়ংক্রিয় ক্রস-ভেরিফিকেশন, কনটেইনারের বাধ্যতামূলক ট্র্যাকিং, ডিপো থেকে বন্দরে পণ্য চলাচলের ডিজিটাল নজরদারি, ঘোষিত ওজনের সঙ্গে প্রকৃত ওজনের স্বয়ংক্রিয় মিল, ঝুঁকিভিত্তিক কনটেইনার পরীক্ষা, কর্মকর্তাদের দায়িত্ব ও অনুমোদনের ডিজিটাল লগ, জাল সিল ও স্বাক্ষর শনাক্তে নিরাপদ ই-অথেন্টিকেশন এবং সন্দেহজনক রপ্তানি চালানের পরবর্তী নিরীক্ষা জোরদার করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে যেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে, সেগুলোর আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম এবং বন্ড সুবিধার ব্যবহার নিয়ে সমন্বিত তদন্ত প্রয়োজন।
শেষ কথা
বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা বাংলাদেশের রপ্তানি অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি-সহায়তা। এই সুবিধা বন্ধ করা সমাধান নয়; বরং এর অপব্যবহার বন্ধ করাই মূল চ্যালেঞ্জ। কারণ ভুয়া রপ্তানি, শুল্ক ফাঁকি, জাল কাগজপত্র, অবৈধ পণ্য খালাস কিংবা ঘুষের বিনিময়ে সরকারি সুবিধা দেওয়ার মতো কর্মকাণ্ডে হয়তো রাস্তায় রক্ত দেখা যায় না। কিন্তু এর আর্থিক ক্ষতি ছড়িয়ে পড়ে রাষ্ট্রের কোষাগার থেকে শিল্প খাত, বৈধ ব্যবসা থেকে সাধারণ ভোক্তা—সবখানে।
এই কারণেই বন্ড সুবিধার অপব্যবহারকে শুধু ‘রাজস্ব ফাঁকি’ হিসেবে দেখলে সমস্যাটির গভীরতা বোঝা যাবে না। এটি একই সঙ্গে অর্থনৈতিক অপরাধ, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং সম্ভাব্য হোয়াইট কলার ক্রাইমের একটি বড় ক্ষেত্র।
প্রশ্ন তাই একটাই—রপ্তানি শিল্পকে প্রতিযোগিতামূলক করতে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছিল, সেটি কি সত্যিই দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছে, নাকি একটি অসাধু চক্রের হাতে পরিণত হয়েছে রাজস্ব লুট ও অর্থনৈতিক অপরাধের হাতিয়ারে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে প্রয়োজন শুধু কাগজে তদন্ত নয়—প্রয়োজন দায় নির্ধারণ, অর্থের উৎস ও গন্তব্য অনুসন্ধান এবং জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা।