লোডশেডিং থাকবে না—এটাই স্বাভাবিক প্রত্যাশা। বিদ্যুৎ মানুষের মৌলিক নাগরিক সেবার পাশাপাশি কৃষি, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা ও দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ। ফলে বিদ্যুৎ সংকট দেখা দিলে শুধু আশ্বাস নয়, প্রয়োজন বাস্তব পরিস্থিতির স্বীকারোক্তি, কার্যকর পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান।
বাংলাদেশে এর আগেও বিদ্যুৎ সংকট ও ব্যাপক লোডশেডিংয়ের অভিজ্ঞতা হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সংকট মোকাবিলায় কুইক রেন্টালসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে এসব উদ্যোগ স্বল্পমেয়াদে ভূমিকা রাখলেও পরবর্তী সময়ে এসব প্রকল্পের ব্যয়, চুক্তির স্বচ্ছতা, বিদ্যুতের মূল্য এবং অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা নিয়ে নানা প্রশ্ন ও অভিযোগ ওঠে। বিদ্যুৎ আমদানির ক্ষেত্রেও ব্যয় ও চুক্তির স্বচ্ছতা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।
সেই অভিজ্ঞতা থেকে বর্তমান সরকারের শিক্ষা নেওয়া জরুরি। সংকট মোকাবিলার নামে এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়, যার আর্থিক বোঝা দীর্ঘদিন জনগণকে বহন করতে হবে।
সংকট হলে সত্যটা জানা জরুরি
সম্প্রতি জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং নেই—এমন বক্তব্য দেওয়া হয়ে থাকলে, তা বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেটি যাচাই করা প্রয়োজন। কারণ কোনো এলাকায় বাস্তবে বিদ্যুৎ বিভ্রাট থাকলে সরকারি বক্তব্যে সেটি অস্বীকার না করে সমস্যার প্রকৃত চিত্র জনগণের সামনে তুলে ধরাই দায়িত্বশীলতার পরিচয়।
সরকারের সঙ্গে জনগণের সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিগুলোর একটি হলো বিশ্বাস। মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা এবং সরকারি বক্তব্যের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য তৈরি হলে সেই বিশ্বাস ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই বিদ্যুৎ সরবরাহে কোথায় ঘাটতি রয়েছে, কেন রয়েছে এবং কতদিনের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি হবে—এসব বিষয়ে নিয়মিত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ করা প্রয়োজন।
বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ালেই সমাধান নয়
বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় শুধু উৎপাদন বাড়ানোর দিকে নজর দিলেই হবে না। উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ—পুরো ব্যবস্থাকে সমন্বিতভাবে শক্তিশালী করতে হবে।
একদিকে যেমন পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে, অন্যদিকে সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে যাতে উৎপাদিত বিদ্যুৎ গ্রাহকের কাছে পৌঁছাতে না পারে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
একই সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহ, বিদ্যুৎকেন্দ্রের দক্ষতা, সিস্টেম লস, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়নের বিষয়গুলোকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ করতে হবে।
তড়িঘড়ি সিদ্ধান্তের খেসারত জনগণকে দিতে হয়
বিদ্যুৎ সংকট দেখা দিলে দ্রুত সমাধানের জন্য সরকারকে অনেক সময় জরুরি সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত যদি দীর্ঘমেয়াদি ব্যয়, অস্বচ্ছ চুক্তি কিংবা অতিরিক্ত ভর্তুকির পথ তৈরি করে, তাহলে সংকট সাময়িকভাবে কমলেও ভবিষ্যতে তার খেসারত দিতে হয় জনগণকেই।
তাই নতুন কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র, বিদ্যুৎ আমদানি, জ্বালানি ক্রয় বা জরুরি প্রকল্প গ্রহণের আগে এর অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা, চুক্তির শর্ত, উৎপাদন ব্যয় এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায় প্রকাশ করা উচিত।
সরকারের প্রতিটি বড় সিদ্ধান্তে প্রশ্ন থাকা দরকার—কী দামে বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে, কার সঙ্গে চুক্তি হচ্ছে, চুক্তির শর্ত কী, সিদ্ধান্ত কতটা প্রতিযোগিতামূলক ও স্বচ্ছ এবং শেষ পর্যন্ত এর খরচ কে বহন করবে? এসব প্রশ্নের উত্তর জানার অধিকার জনগণের রয়েছে।
বিকল্প জ্বালানি ও নবায়নযোগ্য শক্তিতে গুরুত্ব
দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমানোর পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুশক্তিসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে।
বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল ও দুর্গম এলাকায় বিকেন্দ্রীভূত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা, শিল্পকারখানায় ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ এবং বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে। এতে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি ব্যয়ও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হতে পারে।
জনগণের প্রত্যাশা স্পষ্ট
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের ভুল সিদ্ধান্ত ও অনিয়মের সমালোচনা করে যদি বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে থাকে, তাহলে একই ধরনের ভুলের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে তাদের আরও বেশি সতর্ক থাকতে হবে।
জনগণ শুধু সরকারের নাম পরিবর্তন চায় না; তারা চায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংস্কৃতির পরিবর্তন। তারা চায় সরকারি অর্থের প্রতিটি টাকা যেন জনস্বার্থে ব্যয় হয়, বিদ্যুৎ খাতে নেওয়া প্রতিটি বড় সিদ্ধান্ত যেন যাচাইযোগ্য হয় এবং কোনো গোষ্ঠী বা ঠিকাদারি স্বার্থ যেন জাতীয় স্বার্থের ওপর প্রাধান্য না পায়।
লোডশেডিং থাকবে না—এটি অবশ্যই প্রত্যাশা। কিন্তু কোনো কারণে সংকট দেখা দিলে সেটি আড়াল না করে জনগণকে সত্য জানানো, সংকটের কারণ ব্যাখ্যা করা এবং সুস্পষ্ট সমাধানের রোডম্যাপ দেওয়া সরকারের দায়িত্ব।
সাময়িক সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। তবে সেই ব্যবস্থা যেন ভবিষ্যতে ব্যয়বহুল, অস্বচ্ছ ও জনস্বার্থবিরোধী ব্যবস্থার স্থায়ী ভিত্তি তৈরি না করে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ বিদ্যুৎ সংকট সাময়িক হতে পারে, কিন্তু ভুল সিদ্ধান্তের আর্থিক বোঝা জনগণকে বহু বছর ধরে বহন করতে হতে পারে। তাই বিদ্যুৎ খাতে এখন প্রয়োজন উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘমেয়াদি জনস্বার্থভিত্তিক পরিকল্পনা।