দুর্নীতির অদৃশ্য সাম্রাজ্য: পর্ব -১ ⊕ প্রতিবেদন ধামাচাপা দিতে অনৈতিক প্রস্তাব
গণপূর্ত অধিদপ্তরের কাজের পরিধি বিশাল—সরকারি ভবন নির্মাণ, সংস্কার, রক্ষণাবেক্ষণ থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নির্মাণ পর্যন্ত। ফলে এই অধিদপ্তরের প্রকল্প, দরপত্র ও ঠিকাদারি ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তার প্রভাব পড়ে সরাসরি সরকারি অর্থ ও জনস্বার্থে। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, গণপূর্ত অধিদপ্তর বর্তমানে দুর্নীতি, অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের আতুড়ঘরে পরিনত হয়েছে। এখানে নিয়োগ পেতে যেমন মোটা অংকের অর্থ ঘুষ দিতে হয় তেমনি বদলী হতেও গুনতে হয় কাড়ি কাড়ি টাকা। গনপূর্তের অধিকাংশ কর্মকর্তা-প্রকৌশলীর বিরুদ্ধেই রয়েছে দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত অঢেল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ।
এই অধিদপ্তর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ঠিকাদার ও সচেতন নাগরিকদের ভাষ্যমতে, দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে খুলনা গণপূর্ত জোনের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা এবং প্রভাবশালী প্রকৌশলী। বর্তমান সরকারপ্রধান তারেক রহমানের দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতিও বারবার মুখে থুবড়ে পড়ে এখানে। সরকার কিংবা দুদকের যেকোন কঠোর নির্দেশনাও বারংবার উপেক্ষিত এখানে। আর এর নেপথ্যে রয়েছে গনপূর্ত ও গৃহায়ণ মন্ত্রণালয় এবং গণপূর্ত অধিদপ্তরের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তার সমন্বয়ে গঠিত একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটের বদৌলতে গনপূর্তের একেকজন প্রকৌশলী দেশ-বিদেশে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন।
খুলনা গণপূর্তের একাধিক প্রকৌশলী এবং কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঠিকাদার সিন্ডিকেট, টেন্ডার বাণিজ্যে অনিয়ম এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচারের গুরুতর তথ্য-উপাত্ত এফটি টীমের হাতে এসেছে।
`দ্য ফিন্যান্স টুডে`র সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে খুলনা গণপূর্ত জোনে গড়ে উঠা দুর্নীতির এক অদৃশ্য অথচ শক্তিশালী সাম্রাজ্যের পর্দা উন্মোচিত হয়েছে। প্রাথমিক পর্যালোচনা শেষে দুর্নীতিবাজ এসব কর্মকর্তা ও প্রকৌশলীদের মুখোশ উন্মোচনে ধারাবাহিক প্রতিবেদনের ১ম পর্বে আজ তুলে ধরা হলো উক্ত সাম্রাজ্যের অন্যতম স্তম্ভ খুলনা গণপূর্ত জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. সাইফুর রহমানের আমলনামা।
কে এই সাইফুর রহমান?
খুলনা গণপূর্ত জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. সাইফুর রহমান ২০২৬ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি খুলনা জোনে যোগদান করেন। এর আগে তিনি আজিমপুর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
১৮তম ব্যাচের এই প্রকৌশলী দেখতে সুদর্শন হলেও কাজের বেলায় ঠিক তার বিপরীত। তার বিরুদ্ধে ঢাকায় কর্মরত থাকাকালীন জিকে শামীম, গোল্ডেন মনিরের সাথে ঘনিষ্ঠতা এবং আওয়ামী সম্পৃক্ততার অভিগযোগ আছে। শুধু তাই নয়- ২৪ এর ছাত্র আন্দোলনে আওয়ামী লীগের পক্ষে থেকে গণহত্যায় অর্থ যোগানের নেপথ্যে তার অবদানের কথাও শোনা যায়।
রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগ
সাইফুর রহমানের বিরুদ্ধে অতীতে আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠতা এবং রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগানোর অভিযোগও রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্র দাবি করেছে। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় তাঁর ভূমিকা নিয়েও নানা অভিযোগ উঠেছিলো। সেই সময়আওয়ামী লীগের পক্ষে থেকে গণহত্যায় অর্থ যোগানের নেপথ্যে তার অবদানের কথাও শোনা গিয়ছে।
বিতর্কিত ঠিকাদার সিন্ডিকেট প্রথা
আজিমপুর গণপূর্ত বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলী থাকাকালে সাইফুর রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, সরকারি প্রকল্পের দরপত্রে অনিয়ম, কমিশন বানিজ্যসহ একাধিক অভিযোগ উঠেছিলো। তিনি সবচেয়ে বেশী অর্থও উপার্জন করেন আজিমপুর গণপূর্তে থাকাকালে। সেসময় আজিমপুরে বহুল সমালোচিত `ঠিকাদারী সিন্ডিকেট প্রথা` চালু করেছিলেন এই সাইফুর রহমান- যা এখনো চলে আসছে। কমিশন ছাড়া তিনি কোন ফাইলে স্বাক্ষর করতেন না বলেও জানা গেছে।
আজিমপুরে দায়িত্ব পালনকালে তাঁর বিরুদ্ধে সরকারি জায়গায় অবৈধ দোকান পরিচালনা এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ নিয়ে প্রতিবেদনও প্রকাশ করেছিল। তবে সেসময় সাইফুর রহমান অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছিলেন, দীর্ঘদিন ধরে কলোনিভিত্তিক কল্যাণ সমিতির নেতারাই দোকানগুলো নিয়ন্ত্রণ করেন।
খুলনা গণপূর্তের যে কোনও কাজের বিল ও বিভিন্ন ফাইল অনুমোদনের ক্ষেত্রে অনৈতিক সুবিধা চাওয়ার প্রবণতা রয়েছে সাইফুর রহমানের বিরুদ্ধে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক খুলনার একাধিক ঠিকাদার এই প্রতিবেদককে জানান, নির্ধারিত কমিশন ছাড়া সাইফুর রহমান কোন ফাইলে স্বাক্ষর করেন না। কাজের বিল উত্তোলনে তাকে দিতে হয় উপঢৌকন।


অঢেল সম্পদের উৎস কি?
`দ্য ফিন্যান্স টুডে`র প্রাথমিক অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্যমতে, খুলনা গনপূর্তের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. সাইফুর রহমানের ঢাকার মোহাম্মদপুর ও মিরপুরে দুটি আলিশান বাড়ি, পূর্বাচলে প্লট, টাংগাইলের ঘাটাইলে ডুপ্লেক্স বাড়ি রয়েছে। এছাড়া বাজার রোডে ৩ তলা একটি মার্কেটের তথ্য পাওয়া গেছে যেটি তার ভাইয়ের বলে দাবি করেন সাইফুর রহমান।
এছাড়া সালাউদ্দিন সেনানিবাস মোড়ে থাকা এলপিজি ফিলিং স্টেশন ভেঙ্গে সোনারতরী পার্ক, অদূরেই ১ কোটি টাকায় কেনা জমিতে কাঠবাদাম রেস্টুরেন্ট রয়েছে সাইফুরের। অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সাইফুর রহমানের একটি ফ্ল্যাট রয়েছে যেখানে তার মেয়ে বসবাস করছেন বলে জানিয়েছে বিশ্বস্ত একটি সূত্র।
সবমিলিয়ে খুলনা গনপূর্তের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো সাইফুর রহমানের শত কোটি টাকার অঢেল সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান এখনও চলমান আছে। এনিয়ে বিস্তারিত পরবর্তী পর্বে তুলে ধরা হবে।
এদিকে, এসব বিষয়ে বক্তব্য জানতে সাইফুর রহমানের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলে নিজের এক প্রতিনিধির মাধ্যমে নিউজ না করার জন্য প্রস্তাব দেন এবং অর্থের বিনিময়ে বিষয়টি ম্যানেজ করার অপচেষ্টা করেন অভিযুক্ত বিতর্কিত প্রকৌশলী সাইফুর রহমান।