সোমবার, আগস্ট ১০, ২০২৬
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
শিরোনাম :

   জাতীয়
নকল ‘জলিল বিড়ি’র রমরমা কারবার; তদন্তে এনবিআর-দুদক
  Date : 08-08-2026
Share Button

একটি প্রতিষ্ঠিত বিড়ি ব্র্যান্ডের নাম, মোড়ক, ব্যান্ডরোল ও কপিরাইট নকল করে বিড়ি উৎপাদন ও বাজারজাতের অভিযোগ উঠেছে রংপুরের হারাগাছ থানার আবুল টোব্যাকো মোড় এলাকার শফিকুল ইসলাম খলিফার বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে নকল ‘জলিল বিড়ি’ বাজারজাত করে আসছে একটি চক্র। এই ঘটনায় প্রকৃত ব্যবসায়ী ক্ষতির মুখে পড়ার পাশাপাশি সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি।

অভিযোগের বিষয়টি গড়িয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও শিল্প মন্ত্রণালয় পর্যন্ত। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে একাধিক লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

চার দশকের ব্যবসায় ‘নকল’ ব্র্যান্ডের আঘাত

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, কুড়িগ্রাম পৌরসভার আলহাজ আজিজুল হকের ছেলে পনির উদ্দিন আহমেদ মেসার্স জলিল বিড়ির স্বত্বাধিকারী। প্রায় চার দশক ধরে প্রতিষ্ঠানটি সরকারি বিধিবিধান মেনে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে বলে দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি নিয়মিত রাজস্ব প্রদান করে আসছে বলেও সংশ্লিষ্টদের দাবি।

কিন্তু সম্প্রতি রংপুরের হারাগাছ থানার আবুল টোব্যাকো মোড় এলাকার খয়রত মিয়া খলিফার ছেলে শফিকুল ইসলাম খলিফা ‘১ নং জলিল বিড়ি’ নামে বিড়ি প্রস্তুত ও বাজারজাত শুরু করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, মূল ‘জলিল বিড়ি’র নাম, মোড়ক, ব্যান্ডরোল ও কপিরাইটের অনুকরণ করে এসব বিড়ি বাজারজাত করা হচ্ছে। ফলে ক্রেতাদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে এবং প্রকৃত ‘জলিল বিড়ি’র ব্যবসায়িক সুনাম ও বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

ট্রেডমার্ক নিবন্ধন ছাড়াই ব্যবসার অভিযোগ

নকল বিড়ির পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, ‘১ নং জলিল বিড়ি’ নামে ব্যবসা পরিচালনার জন্য শিল্প মন্ত্রণালয়ের পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর থেকে প্রয়োজনীয় ট্রেডমার্ক নিবন্ধন ও ছাড়পত্র নেওয়া হয়নি।

এরপরও ‘১ নং স্পেশাল জলিল বিড়ি’ নামে ভ্যাট নিবন্ধন নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগে উল্লিখিত তথ্য অনুযায়ী, রংপুর বিভাগীয় কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট থেকে প্রতিষ্ঠানটির নামে বিআইএন নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিআইএন নম্বর ০০৭৪৬৫৬৭৪-১০০১।

এখানেই উঠেছে বড় প্রশ্ন—ট্রেডমার্ক ও ব্র্যান্ড ব্যবহারের বৈধতা নিয়ে আপত্তি থাকা সত্ত্বেও কীভাবে একই বা কাছাকাছি নামে ভ্যাট নিবন্ধন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ মিলল?

এনবিআরের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ

অভিযোগকারীদের দাবি, নকল বিড়ি প্রস্তুত ও বাজারজাতকারী চক্রকে সরকারি ব্যবস্থার ভেতরের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী সহযোগিতা করে আসছেন। বিশেষ করে এনবিআরের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সহায়তায় কথিত বিআইএন নিবন্ধন নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

অভিযোগকারীরা বলছেন, সংশ্লিষ্ট বিআইএন নিবন্ধনের বৈধতা যাচাই করে তা বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নকল বিড়ি উৎপাদন ও বাজারজাতের সঙ্গে সরকারি কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের পদক্ষেপ

জলিল বিড়ির নাম ও ব্র্যান্ড নকল করে বিড়ি উৎপাদন ও বাজারজাতের অভিযোগের বিষয়ে শিল্প মন্ত্রণালয় অবহিত হওয়ার পর পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য চিঠি দিয়েছে বলে জানা গেছে।

এর পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট দপ্তর অভিযোগটি যাচাই করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে।

এতে প্রশ্ন উঠেছে, একটি নিবন্ধিত ও দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নামে অন্য একটি প্রতিষ্ঠান কীভাবে বাজারে পণ্য ছাড়ার সুযোগ পেল এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলো তা কীভাবে অনুমোদন করল—এ বিষয়গুলো তদন্তে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।

রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ

নকল বিড়ি বাজারজাতের সঙ্গে সরকারি রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, নকল বিড়ির উৎপাদন ও বাজারজাতের মাধ্যমে একটি চক্র একদিকে প্রকৃত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বাজার দখল করছে, অন্যদিকে সরকারের প্রাপ্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করছে।

বিশেষ করে বিড়ি শিল্পে শুল্ক, ভ্যাট ও অন্যান্য রাজস্বের বিষয় জড়িত থাকায় কথিত নকল পণ্যের মাধ্যমে কত টাকা রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে, তা নিরূপণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিশেষ তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ

নকল বিড়ির কারবারের মাধ্যমে শফিকুল ইসলাম খলিফা ও তার সহযোগীরা বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, তারা নামে-বেনামে বাড়ি, জমি ও গাড়ি কিনেছেন। এমনকি বিপুল অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

তবে এসব সম্পদের তথ্য, মালিকানা ও বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ এই প্রতিবেদকের হাতে পাওয়া যায়নি। দুদক বা সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থার অনুসন্ধানে এসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।

মামলা সত্বেও বন্ধ হয়নি কারবার

সংশ্লিষ্টরা জানান, নকল বিড়ি প্রস্তুত ও বাজারজাত এবং ব্র্যান্ড নকল করার অভিযোগে শফিকুল ইসলাম খলিফা ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা ও ক্ষতিপূরণ মামলা করা হয়েছে। মামলাগুলোর আইনগত কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

তবে অভিযোগকারীদের দাবি, মামলা ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের পরও নকল বিড়ি বাজারজাত পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ফলে প্রকৃত ব্যবসায়ী যেমন ক্ষতির মুখে পড়ছেন, তেমনি ভোক্তাদের মধ্যেও বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে।

তদন্তেই বের হবে প্রকৃত চিত্র

দুদক, এনবিআর ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে অভিযোগ যাওয়ার পর এখন প্রশ্ন—নকল বিড়ি উৎপাদন ও বাজারজাতের পেছনে কারা রয়েছে, কীভাবে তারা সরকারি নিবন্ধন পেল, রাজস্ব ফাঁকির পরিমাণ কত এবং সরকারি কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী এতে জড়িত কি না।

এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে সংশ্লিষ্ট সব নথি, বিআইএন নিবন্ধন, ট্রেডমার্কের কাগজপত্র, উৎপাদন ও বাজারজাতের তথ্য এবং আর্থিক লেনদেন যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কথিত নকল বিড়ির নমুনা পরীক্ষা ও বাজারজাত চ্যানেল অনুসন্ধান করা হলে অভিযোগের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।

এদিকে, উত্থাপিত এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে শফিকুল ইসলাম খলিফার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলেও তিনি কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

অভিযোগের সত্যতা তদন্তাধীন থাকায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পরই এসব অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ সত্যতা নিশ্চিত হবে।



  
  সর্বশেষ
প্রযুক্তির অপব্যবহার, সাইবার অপরাধ ও তথ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি নিয়ে বাড়ছে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ
মালয়েশিয়ায় নতুন কর্মী পাঠানো শুরু হচ্ছে আগস্টের শেষ সপ্তাহে
`অভ্যুত্থানের ৭ আগস্ট জালিয়াতি` গোয়ালন্দ পৌরসভায় ১০ মাস পরের, রাস্তার কাজের টেন্ডার সই হলো পৌনে ৪ কোটি টাকা!
জামালপুর পল্লী বিদ্যুতে কার্টেল জালিয়াতি, জুলাই অভ্যুথানে সরকার পতনের একদিন পর ৬ প্রকল্পে ৩৯ লাখ ৯০ হাজার টাকার টেন্ডার অনুমোদন!

প্রধান সম্পাদক: মতিউর রহমান , সম্পাদক: জাকির হোসেন, নির্বাহী সম্পাদক এসএম আবুল হাসান। সম্পাদক কর্তৃক ২ আরকে মিশন রোড, ঢাকা ১২০৩ থেকে প্রকাশিত এবং বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস ২০১৯ ফকিরাপুল , ঢাকা ১০০০ থেকে মুদ্রিত। বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: জামান টাওয়ার (৪র্থ তলা) ৩৭/২ পুরাণা পল্টন, ঢাকা ১০০০
ফোন: ০১৫৫৮০১১২৭৫, ০১৭১১১৪৫৮৯৮, ০১৭২৭২০৮১৩৮। ই-মেইল: bortomandin@gmail.com, ওয়েবসাইট: bortomandin.com