শাহীন আবদুল বারী
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এর মালয়েশিয়া সফরকে কেন্দ্র করে দেশটিতে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে দেখা দিয়েছে ব্যাপক উৎসাহ, আনন্দ ও উৎসবমুখর পরিবেশ। বিশেষ করে মালয়েশিয়া বিএনপি, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, শ্রমিক দল, জাসাস, প্রবাসী শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ শ্রমজীবী বাংলাদেশিদের মধ্যে এই সফরকে ঘিরে বিরাজ করছে এক অনন্য আবেগ ও উচ্ছ্বাস।।
দীর্ঘ প্রায় এক যুগ পর তারেক রহমানের মালয়েশিয়া আগমনকে অনেকেই "ঐতিহাসিক ও আবেগঘন মুহূর্ত" হিসেবে দেখছেন। দীর্ঘ সময় পর তার আগমন প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য নতুন মাত্রার আনন্দের উপলক্ষ হয়ে উঠেছে। ২০১৪ সালে শেষবার মালয়েশিয়া এসেছিলেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর এই আগমনকে কেন্দ্র করে মালয়েশিয়া বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো দেশটিতে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ প্রবাসীরা এরই মধ্যে দেশটির প্রধান প্রধান শহরগুলোতে বরণ কর্মসূচি প্রায় গুছিয়ে এনেছেন। সংশ্লিষ্টরা প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন।
মালয়েশিয়া বিএনপির সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার বাদলুর রহমান খান (বাদল) বলেন, "প্রধানমন্ত্রীর আগমন আমাদের কাছে শুধু একটি সরকারি সফর নয়, এটি ভালোবাসা, আবেগ ও গর্বের এক মিলনমেলা। পুরো মালয়েশিয়া বিএনপি পরিবার এই বিশেষ মুহূর্তকে বরণ করে নিতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।"
একই অনুভূতি প্রকাশ করে মালয়েশিয়া বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন বলেন, "প্রবাসে থেকেও আমরা দেশের সঙ্গে আত্মিক বন্ধনে আবদ্ধ। প্রধানমন্ত্রীর সফর আমাদের জন্য এক অনন্য অনুপ্রেরণার উপলক্ষ।"
মালয়েশিয়া যুবদলের সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন বলেন, "বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান আমাদের ভালোবাসা ও আবেগের প্রতীক। আমরা বিশ্বাস করি, তার নেতৃত্বেই বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে। প্রবাসে থেকেও আমরা লাল-সবুজের পতাকার মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।"
মালয়েশিয়া যুবদলের সাধারণ সম্পাদক মো. রমজান আলী বলেন, "এই সফর আমাদের জন্য এক আনন্দঘন অধ্যায়। একই সঙ্গে মালয়েশিয়ার সঙ্গে তার পরিবারের স্মৃতিও আমাদের আবেগাপ্লুত করে। আমরা প্রিয় নেতাকে স্বাগত জানাতে উদগ্রীব হয়ে আছি।"
স্বেচ্ছাসেবক দল, শ্রমিক দল, জাসাসসহ বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরাও এই সফরকে ঘিরে নিজেদের উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। পাশাপাশি সাধারণ প্রবাসী শ্রমিক, শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীদের মধ্যেও বিরাজ করছে উৎসবের আবহ। মালয়েশিয়ায় আনুমানিক ১৫ লাখ বাংলাদেশি বসবাস করেন।
প্রধানমন্ত্রীর ৬ দিনের সফরসূচি
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামীকাল ২১ জুন (রবিবার) বিকালে দেশটির উদ্দেশ্যে রওনা হবেন। সন্ধ্যায় কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছে রাতেই দেশটিতে বসবাসরত প্রবাসী পেশাজীবীদের সঙ্গে একটি মতবিনিময় সভায় অংশ নিতে পারেন।
মূলত সফরের আনুষ্ঠানিক পর্ব ২২ জুন অনুষ্ঠিত হবে। সফরের দ্বিতীয় দিন তারেক রহমান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন।মালয়েশিয়ায় সফর শেষে ২২ জুন সন্ধ্যায় চীনের উদ্দেশ্যে রওনা দিবেন। পরে, ২৬ জুন চীন সফর দেশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশে ফিরবেন।
এদিকে, ৬ দিনের এই সফরে প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে মালয়েশিয়ায় থাকবেন ২৭ জন এবং চীনে ২৮ জন। আজ শনিবার (২০ জুন) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আল সিয়াম এই তথ্য জানান।
সফরের কূটনৈতিক গুরুত্ব
প্রধানমন্ত্রীর এই মালয়েশিয়া সফর বৈদেশিক সম্পর্কের দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারত ও চীন উভয় দেশ থেকেই সফরের আমন্ত্রণ পাওয়া সত্ত্বেও তিনি তার প্রথম দ্বিপাক্ষিক সফর হিসেবে মালয়েশিয়াকে বেছে নিয়েছেন।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভারত-চীন প্রতিযোগিতা এড়িয়ে ভারসাম্য রক্ষার কূটনৈতিক কৌশল হিসেবেই এই সফর। এছাড়াও, সাম্প্রতিক সময়ে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমবাজার পুনরায় চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা এই সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম গত এপ্রিলেই এই সফরের আমন্ত্রণ জানান।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের একাংশের মতে, দেশটিতে বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রম এবং সমর্থকদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য। সেই বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে ঘিরে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে বিশেষ আগ্রহ ও প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
প্রবাসী কর্মীদের প্রত্যাশা
বর্তমানে মালয়েশিয়া বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শ্রমবাজার। প্রায় ১০ লাখের বেশি বাংলাদেশি কর্মী কাজ করেন, যারা নির্মাণ, কলকারখানা, সেবা খাতসহ নানা কাজে নিয়োজিত।
সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, দুই সরকার প্রধানের বৈঠকে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং শোষণমুক্ত নিয়োগ ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হবে। মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মীদের অনেক সমস্যা রয়েছে। নিয়োগকারী এজেন্সির অতিরিক্ত ফি, চুক্তিভঙ্গ, নির্যাতন এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের অভিযোগ প্রায়ই ওঠে। নতুন সরকার এসব সমস্যা সমাধানে আলোচনা করবে।
প্রবাসী শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই আগমনকে কেন্দ্র করে মালয়েশিয়া প্রবাসী শিক্ষার্থীদের চাওয়া গ্রাজুয়েট পাস। মালয়েশিয়ায় ৩২টি দেশের জন্য গ্রাজুয়েট পাস চালু থাকলেও বঞ্চিত বাংলাদেশ।
মালয়েশিয়ায় স্নাতক বা উচ্চতর ডিগ্রি সম্পন্ন করা আন্তর্জাতিক ৩২টি দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য গ্রাজুয়েট পাস চালু থাকলেও বঞ্চিত বাংলাদেশী শিক্ষার্থীরা। অনতিবিলম্বে স্পন্সর ছাড়া এক বছর থাকার ও কাজ খোঁজার সুবিধা জন্য ৩৩তম দেশ হিসেবে বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের গ্রাজুয়েট পাস চালুর দাবি পূরণের জন্য প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন শিক্ষার্থীরা।
নতুন বাজার সৃষ্টি
মালয়েশিয়াতে জনশক্তির চাহিদা থাকলেও ২০২৪ সালের জুন থেকে বাংলাদেশি কর্মী নেয়া বন্ধ আছে । তবে এই সফরে দেশটিতে নতুন করে শ্রমবাজার উন্মুক্ত হওয়ার পাশাপাশি মালয়েশিয়ার সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ), রপ্তানি, হালাল ফুড সার্টিফিকেশন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বাণিজ্য, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং ভবিষ্যৎ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারে আলোচনা হবে আশা করা হচ্ছে।