শুক্রবার, জুলাই ১৭, ২০২৬
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
শিরোনাম :

   জাতীয়
জিয়াউর রহমান হত্যায় মোজাফফরকে ৪৫ বছর পর গ্রেপ্তার ঘিরে নতুন প্রশ্ন
  Date : 17-07-2026
Share Button

অনলাইন ডেস্ক:
সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার পলাতক অভিযুক্ত সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর (অব.) মোজাফফর হোসেনকে ৪৫ বছর পর গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকার পর বুধবার (১৫ জুলাই) রাতে রাজধানীর বনানীর একটি বাসা থেকে তাকে আটক করে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। পরদিন বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তাকে সেনাবাহিনীর মিলিটারি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, গোপন তথ্য ও প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে তার অবস্থান শনাক্ত করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর সশস্ত্র বাহিনী বিভাগকে বিষয়টি জানানো হয়। বর্তমানে ৭৭ বছর বয়সী মোজাফফরকে ডিএমপি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার পলাতক আসামি হিসেবে উল্লেখ করেছে। তবে তার বিরুদ্ধে এখন কোন আইনি বা সামরিক প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।

১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে জিয়াউর রহমান নিহত হন। এ ঘটনার অন্যতম আলোচিত বিবরণ পাওয়া যায় সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের বই Bangladesh: A Legacy of Blood-এ।

বইটির বর্ণনা অনুযায়ী, গোলাগুলির শব্দ শুনে কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসার সময় জিয়ার সবচেয়ে কাছে ছিলেন মেজর মোজাফফর হোসেন ও লেফটেন্যান্ট মোসলেহউদ্দিন। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, মোজাফফর দৃশ্যত আতঙ্কিত ও কাঁপছিলেন। একই সময় মোসলেহউদ্দিন জিয়াকে আশ্বস্ত করেন যে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। বইটির দাবি, তখন পর্যন্ত তাদের ধারণা ছিল জিয়াকে হত্যা নয়, সার্কিট হাউস থেকে সরিয়ে নেওয়াই অভিযানের উদ্দেশ্য।

এর কিছুক্ষণ পর লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতিউর রহমান সাবমেশিনগান দিয়ে জিয়াউর রহমানকে গুলি করেন বলে বইটিতে উল্লেখ রয়েছে।

তবে এই বর্ণনা একটি ঐতিহাসিক গ্রন্থের তথ্য; এটি আদালতে সাক্ষ্য হিসেবে উপস্থাপিত বা বিচারিকভাবে যাচাই করা বক্তব্য নয়।

মাসকারেনহাসের বইয়ে দাবি করা হয়েছে, হত্যাকাণ্ডের প্রায় এক ঘণ্টা পর মেজর মোজাফফর, মেজর শওকত আলী ও মেজর রেজা পুনরায় সার্কিট হাউসে ফিরে যান। সেখানে জিয়ার কক্ষে তল্লাশি চালিয়ে ব্যক্তিগত ডায়েরি ও কথিত গোপন নথি খোঁজা হয়। পরে জিয়া এবং তার দুই নিরাপত্তা কর্মকর্তার মরদেহ সামরিক যানে করে সরিয়ে নেওয়া হয়।

একই বইয়ে আরও উল্লেখ রয়েছে, পরে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকেও মোজাফফর উপস্থিত ছিলেন, যেখানে মেজর জেনারেল মঞ্জুর কথিত `বিপ্লবী পরিষদ` গঠনের ঘোষণা দেন। ফলে হত্যার পরিকল্পনা আগে থেকে জানতেন না—এমন দাবি তার পরবর্তী কর্মকাণ্ড নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করে।

বিদ্রোহ ব্যর্থ হওয়ার পর ১ জুন ভোরে কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা চট্টগ্রাম সেনানিবাস ত্যাগ করেন। মাসকারেনহাসের বর্ণনা অনুযায়ী, তাদের বহরে ছিলেন মতিউর রহমান, মাহবুব, মোজাফফর ও ক্যাপ্টেন মুনীর। পথে সরকারপন্থী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে মতিউর ও মাহবুব নিহত হন, মুনীর গ্রেপ্তার হন, কিন্তু মোজাফফর পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।

পরবর্তীতে জিয়া হত্যা-পরবর্তী সামরিক বিচারে ১৮ জন সেনা কর্মকর্তার বিচার হয়। তাদের মধ্যে ১৩ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। তবে মেজর এস এম খালেদ ও মেজর মোজাফফর গ্রেপ্তার এড়িয়ে যান এবং তাদের ধরিয়ে দিতে পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়েছিল।

মেজর জেনারেল (অব.) মইনুল হোসেন চৌধুরীর স্মৃতিকথা এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য: স্বাধীনতার প্রথম দশক-এ মোজাফফর সম্পর্কে আরও কিছু তথ্য উঠে এসেছে।

স্মৃতিকথা অনুযায়ী, ১৯৮৯-১৯৯৩ সালে থাইল্যান্ডে রাষ্ট্রদূত থাকার সময় মইনুলের সঙ্গে ব্যাংককে দেখা করেন পলাতক মেজর খালেদ ও মেজর মোজাফফর। তারা দাবি করেন, মূল পরিকল্পনা ছিল জিয়াউর রহমানকে জীবিত অবস্থায় সেনানিবাসে নিয়ে গিয়ে কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তা ও মন্ত্রীকে অপসারণে চাপ সৃষ্টি করা। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, জেনারেল মঞ্জুরও নাকি শুরুতে পুরো পরিকল্পনা জানতেন না।

মইনুলের বর্ণনায়ও বলা হয়েছে, জিয়াকে খুব কাছ থেকে গুলি করেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতিউর রহমান। সেখানে মোজাফফরকে গুলিবর্ষণকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। তবে এই তথ্যও দুই পলাতক অভিযুক্তের বর্ণনার ওপর ভিত্তি করে লেখা; যা আদালতে যাচাই হয়নি।

বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়েছে, জিয়া হত্যাকাণ্ডের পর মোজাফফর ভারতে আত্মগোপন করেন এবং পরে বিভিন্ন সময় ছদ্মনামে চলাফেরা করেন। তবে ডিএমপির আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে শুধু বলা হয়েছে, তিনি দীর্ঘদিন দেশের বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপনে ছিলেন।

কত বছর তিনি ভারতে ছিলেন, কীভাবে দেশে ফিরলেন, কার সহায়তায় এতদিন আত্মগোপনে ছিলেন কিংবা কেন এত বছর তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি—এসব বিষয়ে সরকার বা সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।

৪৫ বছর পর মোজাফফরের গ্রেপ্তার জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড নিয়ে বহু পুরোনো প্রশ্ন আবারও সামনে এনেছে। সার্কিট হাউসে অভিযানের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল, হত্যার সিদ্ধান্ত কখন নেওয়া হয়েছিল, পরিকল্পনায় আর কারা জড়িত ছিলেন এবং ঘটনার পর কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল—এসব বিষয়ে তার বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

তবে এ মুহূর্তে ঐতিহাসিক বইয়ে প্রকাশিত বর্ণনা, বিভিন্ন স্মৃতিকথার দাবি এবং পুলিশের বর্তমান অভিযোগ—সবকিছুই আনুষ্ঠানিক তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় যাচাই হওয়া বাকি। ফলে মোজাফফরের প্রকৃত ভূমিকা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আদালতের বিচার ও প্রমাণের ওপরই নির্ভর করবে।



  
  সর্বশেষ
ডিজিটাল শব্দের আগমন: বাংলা ভাষার বিবর্তনের নতুন অধ্যায়
‘জুলাই ব্যবসা ও মামলা বাণিজ্যে’ রাজি না হওয়ায় সাইবার বুলিং ও মারাত্মক চরিত্রহননের শিকার আহত জুলাই যোদ্ধা
জুয়া সিন্ডিকেটের লাগামহীন দৌরাত্ম্য: পুলিশ সেজে অনুসন্ধানী সাংবাদিককে প্রাণনাশের হুমকি!
কৃষিকে প্রযুক্তিনির্ভর করতে কৃষকদের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আনা হচ্ছে: প্রধানমন্ত্রী

প্রধান সম্পাদক: মতিউর রহমান , সম্পাদক: জাকির হোসেন, নির্বাহী সম্পাদক এসএম আবুল হাসান। সম্পাদক কর্তৃক ২ আরকে মিশন রোড, ঢাকা ১২০৩ থেকে প্রকাশিত এবং বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস ২০১৯ ফকিরাপুল , ঢাকা ১০০০ থেকে মুদ্রিত। বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: জামান টাওয়ার (৪র্থ তলা) ৩৭/২ পুরাণা পল্টন, ঢাকা ১০০০
ফোন: ০১৫৫৮০১১২৭৫, ০১৭১১১৪৫৮৯৮, ০১৭২৭২০৮১৩৮। ই-মেইল: bortomandin@gmail.com, ওয়েবসাইট: bortomandin.com