সাবেক সমন্বয়ক সিরাজুম মুনিরা ও বরকত উল্লাহ ফাহাদ এবং ছাত্রলীগ কর্মী সাব্বির রহমান সাগরসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে মামলা
আব্দুর রহিম: জুলাই গণ-আন্দোলনের শহীদ ও আহতদের স্মৃতিকে পুঁজি করে গড়ে ওঠা ‘জুলাই ব্যবসা’ ও অনৈতিক টেন্ডার, কমিশন, দখল ও ‘মামলা বাণিজ্যের’ প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় সাইবার বুলিং ও মারাত্মক চরিত্রহননের শিকার হয়েছেন এক গুলিবিদ্ধ আহত জুলাই যোদ্ধা। এই অভিযোগে ঢাকার বিজ্ঞ সাইবার ট্রাইব্যুনালে ১০ জনের বিরুদ্ধে একটি পিটিশন মামলা দায়ের করা হয়েছে। ভুক্তভোগী মারুফা আক্তার (মায়া) বাদী হয়ে এই মামলাটি দায়ের করেন। তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একজন গেজেটভুক্ত আহত জুলাই যোদ্ধা এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির (NCP) সহযোগী সংগঠন ‘যুবশক্তি’র পাবনা জেলা শাখার সদস্য সচিব, যিনি বর্তমানে দল থেকে সাময়িক অব্যাহতিতে রয়েছেন।
এই প্রতিবেদকের সাথে সরাসরি আলাপকালে মারুফা আক্তার মায়া তাঁর সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে অভিযোগের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেন। মায়া জানান, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একজন গেজেটভুক্ত আহত জুলাই যোদ্ধা এবং এনসিপি (NCP)-র নেত্রী হিসেবে তিনি শুরু থেকেই জুলাই আন্দোলনের মূল চেতনা ধরে রাখার পক্ষে সোচ্চার ছিলেন। আন্দোলনের পরবর্তী সময়ে পাবনাসহ বিভিন্ন এলাকায় ছাত্র হত্যার মামলাকে কেন্দ্র করে একটি স্বার্থান্বেষী মহল প্রায় কয়েকশো মানুষের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে ‘মামলা বাণিজ্য’ ও অনৈতিকভাবে আর্থিক লেনদেন করছিল। মারুফা মায়া এই ‘জুলাই ব্যবসা’ এবং নিরীহ মানুষদের ফাঁসিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অপতৎপরতার তীব্র বিরোধিতা ও প্রতিবাদ জানান। তিনি প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে মামলা করতে গিয়েও বারবার ব্যর্থ হয়েছেন।

বাদীর দাবি অনুযায়ী, এই বিরোধিতার কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে ১ নং আসামি সিরাজুম মুনিরা ও ৫ নং আসামি বরকত উল্লাহ ফাহাদের নেতৃত্বে আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে তাঁর সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ধ্বংস করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। প্রথমে তারা মায়াকে ভুয়া আহত হিসেবে প্রমাণ করার জন্য চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। পরবর্তীতে আসামিরা বাদীর ফেসবুক ও ব্যক্তিগত গ্যালারি থেকে ছবি সংগ্রহ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) প্রযুক্তির সাহায্যে তা বিকৃত ও অশ্লীল ছবিতে রূপান্তর করে। এরপর ‘Pabna Insider News’ এবং ‘Hello Pabna’ নামক ফেসবুক পেজ ও বিভিন্ন ভুয়া আইডির মাধ্যমে বাদীর বিকৃত ছবি ব্যবহার করে ‘সার্ভিস প্রোভাইডার’ হিসেবে অসত্য ও অবমাননাকর ক্যাপশন দিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
মারুফা মায়া আরও প্রকাশ করেন, ঘটনার পর ন্যায়বিচার পাওয়ার আশায় তিনি প্রথমে গত ৩ মে ২০২৬ তারিখে রাজধানীর হাতিরঝিল থানায় এজাহার দায়ের করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু থানা কর্তৃপক্ষ সরাসরি মামলা গ্রহণ না করে একটি সাধারণ ডায়েরি করার পরামর্শ দেয়। পরবর্তীতে ডিবি (DB) তদন্তের সূত্র ধরে তিনি সাইবার ট্রাইব্যুনালে এই পিটিশন মামলাটি দায়ের করেন। আরজির তথ্যমতে, ১ নং আসামি সিরাজুম মুনিরা বাদীর বাসায় সাবলেট থাকার সুযোগে বাদীর ফোন থেকে আন্দোলনে সরাসরি গুলি চালানো আওয়ামী প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নানা গুরুত্বপূর্ণ ভিডিও ফুটেজ ও নথিপত্র ডিলিট করে দেন এবং জিমেইল মিরর করার মাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য ও ছবি চুরি করেন।

মামলার বিবাদীরা হলেন— বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন পাবনা জেলা কমিটির সাবেক সমন্বয়ক, সাবেক মুখপাত্র ও বর্তমানে মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের শিক্ষার্থী সিরাজুম মুনিরা; ছাত্রলীগ কর্মী সাব্বির রহমান সাগর ওরফে সাগর মন্ডল; জুলাইয়ে আহত ও জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির (NCP) পাবনা জেলা কমিটির জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সম্পাদক মোসা. শামীমা সুলতানা এবং মাহফুজুর রহমান; শিবির কর্মী ও ‘পাবনা স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন’-এর অ্যাডমিন এম এইচ অনিক; বর্তমানে আইন নিয়ে পড়াশোনা চলমান থাকা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন পাবনা জেলা কমিটির সাবেক আহ্বায়ক ও এনসিপির জেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক (যিনি পূর্বে ছাত্রশিবির ও বর্তমানে যুব জামায়াতের যুগ্ম সদস্য সচিব বলেও জানা যায়) বরকত উল্লাহ ফাহাদ; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী এবং ১ নং বিবাদী সিরাজুম মুনিরার স্বামী (যিনি বিভিন্ন সামাজিক গ্রুপগুলোতে আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার অন্যতম অর্থ জোগানদাতা) সাইমন সিহাব; ‘হ্যালো পাবনা’ ফেসবুক গ্রুপের অ্যাডমিন সজীব আহমেদ; সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্টকারী অভিযুক্ত সহযোগী আসরাফুল ইসলাম এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় মিথ্যা অপপ্রচার চালানোর অন্যতম মদদদাতা অভিযুক্ত সহযোগী শারমিন সুলতানা রেখা।
বাংলাদেশের মানুষের আশা জাগানো জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা যাতে কলঙ্কিত না হয় এবং তা সফলভাবে মানুষের কাছে স্থান পায়, তার বিপরীতে ঘটা এমন গুরুতর তথ্যবহুল মামলায় অভিযুক্ত সুনির্দিষ্ট ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতা এবং তাঁদের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে আমাদের অনুসন্ধান চলমান রয়েছে। অতি শীঘ্রই এই বিষয়ে বিস্তারিত পরবর্তী প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে।