বুধবার, জুলাই ৮, ২০২৬
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
শিরোনাম :

   বিশেষ সংবাদ
দুবাইয়ে ৩ মাফিয়া, বাংলাদেশে আরিফুর: আইটি চাকরির ফাঁদে নারী শিক্ষার্থী, জুয়া ও হুন্ডির মাধ্যমে পাচার হাজার কোটি টাকা
  Date : 08-07-2026
Share Button

আবদুর রহিম: সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে বিলাসবহুল জীবন এবং ডেরা দুবাইয়ের লাইভ স্বর্ণের রেটের আড়ালে বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে পরিচালিত হচ্ছে হাজার কোটি টাকার আন্তর্জাতিক অনলাইন জুয়া ও অবৈধ হুন্ডির এক দানবীয় সিন্ডিকেট। দুবাই সরকারের অর্থনীতি ও পর্যটন বিভাগ এবং রেসিডেন্সি বিভাগ থেকে বাণিজ্যিক লাইসেন্স নিয়ে এই সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন নোয়াখালীতে জন্মগ্রহণকারী ও ফেনী অঞ্চলের বাসিন্দা জিয়াউর রহমান (জিয়া), পিতা- মাহফুজুর রহমান। আর বাংলাদেশে ‘ভুয়া আউটসোর্সিং ব্যবসা’র ছদ্মবেশে এই চক্রের মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছিলেন ফেনীরই মুহাম্মাদ আরিফুর রহমান, পিতা- মোঃ শাহাব উদ্দিন।

সবুজবাগ থানায় দায়েরকৃত মামলার এজহারে বর্ণিত `New Bashundhara Jewellery Trading CO. L.L.C`র বিস্তারিত তথ্য খুঁজতে গিয়ে আমাদের হাতে দুবাইয়ের ডেরা এলাকায় নিবন্ধিত এই কথিত স্বর্ণ ব্যবসার (বাণিজ্যিক লাইসেন্স নম্বর: ১২*****১) মূল অংশীদারদের তথ্য উঠে এসেছে। দুবাই সরকারের অফিসিয়াল নথি অনুযায়ী, এই কোম্পানির মালিকানার খতিয়ান নিচে তুলে ধরা হলো:

 



জিয়াউর রহমান (জিয়া): আলোচিত এই সিন্ডিকেটের প্রধান গডফাদার এবং দুবাই কোম্পানির সর্বোচ্চ ৫০% শেয়ারের মালিক জিয়াউর রহমানের পাসপোর্ট নম্বর: EJ******9, পূর্ববর্তী পাসপোর্ট নম্বর: BM******8, পিতা- মাহফুজুর রহমান। দুবাইয়ে বসে অবৈধ উপায়ে বিগত আমলের দুর্নীতিবাজ এমপি-মন্ত্রীদের হাজার হাজার কোটি টাকা দুবাইসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাচার করাই ছিল তার কাজ। সে হুন্ডির মাধ্যমে আনা অর্থ দিয়ে ফেনীর বিভিন্ন প্রজেক্টে কয়েকশত বিঘা জমি এবং ঢাকার কাকরাইলে একটি ২০ তলা বহুতল ভবন নির্মাণে বিনিয়োগ করেছে। এছাড়া ঢাকার রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের সাথে তার একটি বিলাসবহুল বাড়ি রয়েছে বলে জানা গেছে।

মোহাম্মদ কাওসার এলাহী: পাসপোর্ট নম্বর: A1******8, পিতা- মোহাম্মদ শাহ আলম। এই চক্রের ২০% শেয়ারের মালিক এবং দুবাই-বাংলাদেশ হুন্ডি ট্রানজেকশনের মূল সমন্বয়ক। সে এখন পর্যন্ত প্রায় কয়েকশত কোটি টাকা অবৈধ হুন্ডি ও বিটকয়েনের মাধ্যমে পাচার করেছে।

মোহাম্মদ মাসুম ভূঁইয়া: পাসপোর্ট নম্বর: A0******1 এবং পিতা: মোহাম্মদ নূরুল করিম, তবে এসব তথ্য তার প্রকৃত পরিচয় নয়। এই চক্রের ১৫% শেয়ারের অংশীদার। এই বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের প্রথম পর্বে তার নাম অপ্রকাশিত ছিল। তবে, এফটি টিমের নিজস্ব অনুসন্ধানে বর্তমানে মাসুম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে যাবতীয় তথ্য-প্রমাণ দ্য ফিন্যান্স টুডের হাতে এসেছে। খুব শীঘ্রই মাসুমকে নিয়ে একটি অনুসন্ধানী রিপোর্ট পরবর্তী পর্বে প্রকাশিত হবে। উক্ত প্রতিবেদনে তার সকল জালিয়াতির প্রমাণ তুলে ধরা হবে।

মূলত অবৈধ অস্ত্রের ব্যবসা দিয়ে তার অপরাধের হাতেখড়ি হলেও মাসুম ভূঁইয়া কখনোই আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে ধরা পড়েনি। এরপর সে স্বর্ণ চোরাচালান চক্রের সঙ্গে জড়িত হয় এবং বিমানবন্দরে স্বর্ণসহ আটকও হয়েছিল। এই হুন্ডি ও জুয়া মাফিয়া শুধু অর্থ পাচারেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিজের ও তার জন্মদাতা পিতার নাম পরিবর্তন করে ভুয়া পাসপোর্ট তৈরি করেছে। একই সঙ্গে নিজের মা ও ভাইবোনদের সঙ্গেও সে লোমহর্ষক জاليةতি ও প্রতারণা করেছে।

মুহাম্মাদ আরিফুর রহমান: পিতা- মোঃ শাহাব উদ্দিন, বাংলাদেশে বসে এই সিন্ডিকেটের পুরো কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণকারী মূল এজেন্ট বা ৪ নম্বর মাফিয়া। সে নিজেকে "কম্পিউটার বা আউটসোর্সিং ব্যবসায়ী" দাবি করে এদেশের সাধারণ মধ্যবিত্ত ও গরিব পরিবারের অনার্স-มাস্টার্স পড়ুয়া মেয়েদের চাকরি দেওয়ার নামে অপরাধের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছিল। এই চক্রের সাথে জড়িত মেয়েদের পরিবারের কেউ জানতেন না যে তাদের সন্তানরা ঢাকায় কী কাজ করে। ইউপি চেয়ারম্যানও তাকে চেনেন না বলে আমাদের জানিয়েছেন। পরবর্তীতে তার এলাকার মেম্বার সেলিম দেওয়ানের মাধ্যমে আরিফুরের বাবার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, তার ছেলে মিরপুরে একটি কম্পিউটার আউটসোর্সিংয়ের অফিস পরিচালনা করে। তিনি বিন্দুমাত্র জানতেন না যে তার নিজের সন্তান এই কুখ্যাত মাফিয়া চক্রের অন্যতম সদস্য।

(উল্লেখ্য, এই জুয়েলারি কোম্পানির সাবেক আরও একজন ১৫% শেয়ারের অংশীদার ছিলেন। তবে স্বর্ণের ব্যবসার আড়ালে আন্তর্জাতিক হুন্ডি ও জুয়ার সিন্ডিকেট পরিচালিত হচ্ছে বুঝতে পেরে তিনি অনতিবিলম্বে নো অবজেকশন সার্টিফিকেট (NOC) দিয়ে এবং নিজের পার্টনার ভিসা বাতিল করে এই কুখ্যাত চক্র থেকে নিজেকে পুরোপুরি প্রত্যাহার করে নেন। তার সুরক্ষার স্বার্থে ও তদন্তের সুবিধার্থে তার নাম আপাতত প্রকাশ করা হচ্ছে না)

 



বিজ্ঞ আদালত আসামিদের ২ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। রিমান্ড শুনানির নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, আরিফুর রহমান ১ থেকে ৪ নম্বর আসামি অর্থাৎ ৪ জন নারী শিক্ষার্থীকে নিয়োগ দেন এবং তাদের মাসিক বেতন ১৩ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়। পুলিশ তাদের নথিতে উল্লেখ করেছে যে, দুবাইয়ের ওই জুয়েলারি কোম্পানির নাম নকল করে এই ভুয়া ক্লোন পোর্টালটি তৈরি করা হয়েছে। অথচ দুবাই সরকারের লাইসেন্স বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, যে ‘নিউ বসুन्धরা জুয়েলারি’র লাইসেন্সের অধীনে এই সাইট চালানো হচ্ছিল, সেটির আসল মালিকই হলেন দুবাইয়ে বসে থাকা মূল মাফিয়ারা। অর্থাৎ এটি কোনো নকল বা হ্যাক করা পোর্টাল নয়, বরং মাফিয়াদের সরাসরি মালিকানাধীন জুয়ার সাইট। পুলিশ কেন আইনি কাগজপত্রে এটিকে "নকল পোর্টাল" বলে উল্লেখ করেছে, তা আমাদের জানা নেই।

 

প্রান্তিক পরিবারগুলোতে কান্নার রোল ও চরম বিস্ময়: অনুসন্ধানের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক অধ্যায়টি উন্মোচিত হয়েছে যখন এই গ্রেফতারকৃতদের স্থায়ী এলাকায় গিয়ে তাদের পরিবার ও জনপ্রতিনিধিদের সাথে যোগাযোগ করা হয়। তারা প্রত্যেকেই এই অপরাধের নেটওয়ার্ক সম্পর্কে সম্পূর্ণ অন্ধকারে ছিলেন:

  • আরিফুরের বাবা মোঃ শাহাব উদ্দিন (ফেনী): দীর্ঘ ২৭ বছর সৌদি আরবে রক্ত জল করা অবসরপ্রাপ্ত এই বৃদ্ধ বাবা তার ছেলের গ্রেফতারের খবর শুনে ফোনে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, তার ছেলে ঢাকায় একটি সাধারণ কম্পিউটার সেন্টার চালায় বলে তারা জানতেন, সে যে জুয়া ও হুন্ডির সাথে জড়িত তা তারা কখনো কল্পনাও করেননি।

  • মুমুর পরিবার (নবাবগঞ্জ, ঢাকা): আন্ধারকোটা গ্রামের সাবেক মেম্বার জানান, মুমুর বাবা মতিয়ার রহমান হজের ট্রাভেলসে অত্যন্ত সুনামের সাথে চাকরি করেন এবং পরিবারটি এলাকায় শিক্ষিত ও ভদ্র পরিবার হিসেবে পরিচিত। মেয়ে মানুষ হয়ে মুমু ঢাকায় এই জুয়া ও হুন্ডি চক্রের ঢাল হিসেবে কাজ করছিল—এটি শুনে এলাকার সবাই চরম হতবাক।

  • রাবেয়া বসরির পিতা এনামুল কবির (দিনাজপুর): দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটের অত্যন্ত দরিদ্র এই পিতা জানান, রাবেয়া ঢাকাতে একটি "কম্পিউটার চাকরি" করে পরিবারে সামান্য কিছু টাকা পাঠাত। তার নিরীহ মেয়েটি যে দুবাই মাফিয়াদের দাবার ঘুঁটি হয়ে রিমান্ডে খাটছে, তা শুনে বৃদ্ধ বাবা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।

  • ইপছিকুন নাহার বৃষ্টির পরিবার (ময়মনসিংহ): ছনধরা ইউনিয়নের মেম্বার জানিয়েছেন, বৃষ্টির গ্রেফতারের খবর পাওয়ার পর তিনি নিজে খোঁজ নিয়েছেন এবং জানিয়েছেন যে, তাদের সুনির্দিষ্ট কোনো খোঁজ এখনও পাওয়া যায়নি।

অনুসন্ধান অব্যাহত: আমরা খুব শীঘ্রই এই মাফিয়া চক্রের অন্যতম অংশীদার মাসুমের পাসপোর্ট জালিয়াতি, কোটি কোটি টাকার অসৎ ব্যবসা এবং তার ভাইবোন ও মায়ের সাথে করা ভয়ংকর জালিয়াতির নথিপত্র নিয়ে বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করতে যাচ্ছি। বাংলাদেশ যখন সমৃদ্ধির দিকে ধাবিত হচ্ছে, তখন এই ধরনের মাফিয়া চক্রের অর্থ পাচারের কারণে দেশ বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকটে পড়ছে। চোরাচালান, অবৈধ জুয়া এবং মানিলন্ডারিংয়ের এই চক্রের শেকড় কতদূর বিস্তৃত, তা বের করতে গণমাধ্যম এবং পুলিশ সম্মিলিতভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

 



  
  সর্বশেষ
কৃষিকে প্রযুক্তিনির্ভর করতে কৃষকদের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আনা হচ্ছে: প্রধানমন্ত্রী
দুবাইয়ে ৩ মাফিয়া, বাংলাদেশে আরিফুর: আইটি চাকরির ফাঁদে নারী শিক্ষার্থী, জুয়া ও হুন্ডির মাধ্যমে পাচার হাজার কোটি টাকা
চীন সফরে প্রধানমন্ত্রীর দুর্দান্ত মাস্টারস্ট্রোক
দুবাই-ঢাকা স্বর্ণ সিন্ডিকেটের আড়ালে হাজার কোটি টাকার জুয়া ও হুন্ডি: গ্রেপ্তার ৫, নেপথ্যে মাফিয়া রাজত্ব

প্রধান সম্পাদক: মতিউর রহমান , সম্পাদক: জাকির হোসেন, নির্বাহী সম্পাদক এসএম আবুল হাসান। সম্পাদক কর্তৃক ২ আরকে মিশন রোড, ঢাকা ১২০৩ থেকে প্রকাশিত এবং বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস ২০১৯ ফকিরাপুল , ঢাকা ১০০০ থেকে মুদ্রিত। বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: জামান টাওয়ার (৪র্থ তলা) ৩৭/২ পুরাণা পল্টন, ঢাকা ১০০০
ফোন: ০১৫৫৮০১১২৭৫, ০১৭১১১৪৫৮৯৮, ০১৭২৭২০৮১৩৮। ই-মেইল: bortomandin@gmail.com, ওয়েবসাইট: bortomandin.com