নেহাল আহমেদ
একদিন "রেল", "স্কুল", "টেবিল" কিংবা "টেলিফোন" শব্দগুলোও ছিল বাংলা ভাষার কাছে অপরিচিত। সময়ের ব্যবহারে সেগুলো আজ এতটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে যে এগুলোকে আর বিদেশি শব্দ বলে মনে হয় না। ঠিক একইভাবে আজ "ডিলিট", "আপলোড", "লগইন", "ইমোজি", "প্রম্পট", "এআই" কিংবা "চ্যাটজিপিটি" শব্দগুলোও দ্রুত বাংলা ভাষার দৈনন্দিন ব্যবহারের অংশ হয়ে উঠছে। প্রশ্ন হলো—এটি কি বাংলা ভাষার সংকট, নাকি ভাষার স্বাভাবিক বিবর্তন?
ভাষাবিজ্ঞানীরা দ্বিতীয় মতটিকেই সমর্থন করেন। তাঁদের মতে, ভাষা কোনো স্থির কাঠামো নয়; এটি একটি জীবন্ত সামাজিক ব্যবস্থা। মানুষের জীবনযাত্রা, জ্ঞান, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও যোগাযোগের ধরন বদলালে ভাষাও বদলে যায়। নতুন বাস্তবতাকে প্রকাশ করার জন্য ভাষা নতুন শব্দ গ্রহণ করে, পুরোনো শব্দের অর্থ পরিবর্তন করে এবং কখনো নিজেই নতুন শব্দ সৃষ্টি করে। এ কারণেই ভাষা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে টিকে থাকে।
বাংলা ভাষার ইতিহাসও এই পরিবর্তনের ইতিহাস। সংস্কৃত, পালি, প্রাকৃত, আরবি, ফারসি, পর্তুগিজ ও ইংরেজি—বিভিন্ন ভাষার অসংখ্য শব্দ আজ বাংলা ভাষার অবিচ্ছেদ্য অংশ। একসময় যেসব শব্দকে বিদেশি বলা হতো, আজ সেগুলো ছাড়া বাংলা ভাষা কল্পনাই করা যায় না।
বর্তমান যুগে প্রযুক্তি ভাষা পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি। স্মার্টফোন, ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে যেমন বদলে দিয়েছে, তেমনি বদলে দিয়েছে আমাদের ভাষাকেও। এখন আমরা খুব স্বাভাবিকভাবেই বলি—"ফাইলটা আপলোড করো", "ছবিটা ডিলিট করে দাও", "আমাকে ইনবক্স করো", "পোস্টটা দেখেছ?", "লিংকটা পাঠাও", "একটা স্ক্রিনশট দাও", "চ্যাটজিপিটিকে জিজ্ঞেস করো" কিংবা "একটা ভালো প্রম্পট লিখে দাও।"
লক্ষণীয় বিষয় হলো, এসব শব্দ শুধু বাংলায় প্রবেশ করেনি; বাংলা ব্যাকরণের সঙ্গেও নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে। আমরা বলি—"ডিলিট করেছি", "ব্লক দিয়েছে", "ইনবক্স করো", "পোস্টটা", "চ্যাটজিপিটিকে"। অর্থাৎ বিদেশি শব্দের সঙ্গে বাংলা ক্রিয়া, বিভক্তি ও বাক্যগঠন যুক্ত হয়ে নতুন ভাষাগত রূপ তৈরি হয়েছে। ভাষাবিজ্ঞানে এই প্রক্রিয়াকে নেটিভাইজেশন বা ভাষাগত অভিযোজন বলা হয়।
ডিজিটাল যুগে শুধু প্রযুক্তিগত শব্দই নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভাষাও দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। "ওএমজি (OMG)", "ওয়াও (Wow)", "এলওএল (LOL)", "ব্রো", "ভাইব", "ক্রাশ", "রিল", "স্টোরি", "লাইভ", "ভাইরাল" কিংবা "ট্রেন্ডিং"—এসব শব্দ এখন তরুণদের ভাষা ছাড়িয়ে প্রায় সব বয়সের মানুষের কথোপকথনে স্থান করে নিয়েছে।
তবে সব নতুন শব্দ যে সঙ্গে সঙ্গে অভিধানে স্থান পায়, তা নয়। কোনো শব্দ দীর্ঘদিন মানুষের মুখে মুখে ব্যবহৃত হলে, সাহিত্য, গণমাধ্যম ও শিক্ষাক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্যতা পেলে তবেই তা অভিধানের অংশ হয়ে ওঠে। ভাষার ইতিহাস তাই বলে, আজকের নতুন শব্দই আগামী দিনের স্বীকৃত শব্দভাণ্ডার হতে পারে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও রয়েছে। নতুন শব্দ গ্রহণের পাশাপাশি কি বাংলা প্রতিশব্দ তৈরির কাজও সমানভাবে এগোচ্ছে? প্রযুক্তির অনেক আন্তর্জাতিক পরিভাষা অনুবাদ করা কঠিন বা অপ্রয়োজনীয় হলেও, যেখানে সুন্দর ও সহজ বাংলা প্রতিশব্দ সম্ভব, সেখানে তা ব্যবহার ও জনপ্রিয় করার উদ্যোগ থাকা উচিত। কারণ ভাষার আধুনিকতা যেমন জরুরি, তেমনি তার নিজস্ব পরিচয় ও সৌন্দর্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বায়নের এই সময়ে বাংলা ভাষার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা এবং একই সঙ্গে নিজের শিকড়কে অটুট রাখা। নতুন প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে বাংলা ভাষা যদি নতুন ধারণা প্রকাশের সক্ষমতা অর্জন করতে পারে, তবে তার ভবিষ্যৎ আরও শক্তিশালী হবে।
ভাষা কখনো থেমে থাকে না। মানুষের মতোই তারও চলার পথ আছে, পরিবর্তনের ইতিহাস আছে। ডিজিটাল যুগের নতুন শব্দগুলো সেই চলমান ইতিহাসেরই অংশ। তাই এই পরিবর্তনকে ভয় পাওয়ার নয়; বরং গবেষণা, সচেতনতা ও ভাষাপ্রেমের মাধ্যমে গ্রহণ করার সময় এসেছে। প্রযুক্তি ও মাতৃভাষার সৃজনশীল সমন্বয়ই আগামী দিনের বাংলা ভাষাকে আরও সমৃদ্ধ, আধুনিক এবং বিশ্বজনীন করে তুলবে।
লেখক একজন বিশিষ্ট কলামিস্ট, নীতি বিশ্লেষক, উন্নয়নকর্মী, কবি, ও সাংবাদিক।