পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একের পর এক ভূমিকম্পের ঘটনায় মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। তুরস্ক ও সিরিয়ায় ভয়াবহ ভূমিকম্পে ব্যাপক প্রাণহানি, মরক্কো, আফগানিস্তান, নেপাল, ইন্দোনেশিয়া ও জাপানে শক্তিশালী কম্পন—সব মিলিয়ে ভূমিকম্প যেন বৈশ্বিক আতঙ্কের নতুন কারণ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হচ্ছে নিয়মিত। ফলে প্রশ্ন উঠছে—পৃথিবীতে কি সত্যিই ভূমিকম্পের সংখ্যা বেড়ে গেছে? নাকি আধুনিক প্রযুক্তির কারণে এখন আগের চেয়ে বেশি ভূমিকম্পের খবর মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে?
আর মুসলিম সমাজে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি প্রশ্ন—ঘন ঘন ভূমিকম্প কি কেয়ামতের আলামত?
বিজ্ঞান ও ইসলামী ধর্মতত্ত্বের ব্যাখ্যা পাশাপাশি রাখলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়।
ভূমিকম্প কি সত্যিই বেড়েছে?
ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলোর দীর্ঘমেয়াদি তথ্য বলছে, বড় মাত্রার ভূমিকম্পের বার্ষিক গড় সংখ্যা গত এক শতকে নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়নি। তবে ভূমিকম্প শনাক্ত ও রেকর্ড করার প্রযুক্তি উন্নত হওয়ায় বর্তমানে ছোট-বড় প্রায় সব কম্পনের তথ্য দ্রুত পাওয়া যায়।
আগে প্রত্যন্ত অঞ্চলে সংঘটিত তুলনামূলক ছোট ভূমিকম্প অনেক সময় স্থানীয় মানুষের বাইরে কারও জানা হতো না। এখন উন্নত সিসমিক নেটওয়ার্ক, স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন সংবাদমাধ্যমের কারণে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের ভূমিকম্প কয়েক মিনিটের মধ্যেই আন্তর্জাতিক সংবাদে পরিণত হয়।
ফলে মানুষের কাছে মনে হতে পারে, ভূমিকম্পের সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে।
ভূতাত্ত্বিকদের ব্যাখ্যা হলো, পৃথিবীর টেকটোনিক প্লেটগুলো সবসময়ই গতিশীল। এই প্লেটগুলোর সংঘর্ষ, বিচ্যুতি ও ঘর্ষণের কারণে ভূগর্ভে শক্তি জমা হয়। একসময় সেই শক্তি আকস্মিকভাবে মুক্ত হলে ভূমিকম্প সৃষ্টি হয়।
‘রিং অব ফায়ার’ কেন এত ভূমিকম্পপ্রবণ?
প্রশান্ত মহাসাগরকে ঘিরে থাকা অঞ্চলকে বলা হয় ‘রিং অব ফায়ার’। বিশ্বের সবচেয়ে সক্রিয় ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরি অঞ্চলগুলোর একটি এটি।
এখানে একাধিক টেকটোনিক প্লেটের পারস্পরিক সংঘর্ষ ও সঞ্চালন ঘটে। ফলে এ অঞ্চলে নিয়মিত ভূমিকম্প হয়।
বিজ্ঞানীরা মনে করেন, ভূমিকম্প পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক বিবর্তনের একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। অর্থাৎ, ভূমিকম্পের অস্তিত্ব নতুন কোনো ঘটনা নয়; পৃথিবীর দীর্ঘ ইতিহাসজুড়েই এই প্রক্রিয়া চলে আসছে।
হাদিসে ভূমিকম্প বৃদ্ধির কথা
ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি কিছুটা ভিন্নভাবে দেখা হয়। সহিহ বুখারির একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) কেয়ামতের পূর্ববর্তী কিছু আলামতের উল্লেখ করতে গিয়ে ভূমিকম্প বেড়ে যাওয়ার কথা বলেছেন।
হাদিসে এসেছে, কেয়ামতের আগে ইলম কমে যাবে, অজ্ঞতা বৃদ্ধি পাবে, হত্যা বেড়ে যাবে এবং ভূমিকম্প বৃদ্ধি পাবে।
এই কারণে অনেক আলেম ভূমিকম্পের ঘনঘটাকে কেয়ামতের ছোট আলামতগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, বর্তমানে সংঘটিত প্রতিটি ভূমিকম্পকে সরাসরি কেয়ামতের নিদর্শন হিসেবে ঘোষণা করা যাবে।
তিন বড় ভূমিধসের কথাও আছে
সহিহ মুসলিমে কেয়ামতের পূর্বে পূর্বাঞ্চল, পশ্চিমাঞ্চল ও আরব উপদ্বীপে তিনটি বড় ধরনের ভূমিধসের কথা উল্লেখ রয়েছে।
তবে এসব বর্ণনার সঙ্গে বর্তমান সময়ের নির্দিষ্ট কোনো ভূমিকম্প বা ভূমিধসকে নিশ্চিতভাবে এক করে দেখা নিয়ে সতর্ক থাকার প্রয়োজন রয়েছে। কারণ কেয়ামতের সুনির্দিষ্ট সময় ও বড় আলামতগুলোর চূড়ান্ত বাস্তবায়ন সম্পর্কে নিশ্চিত জ্ঞান মানুষের নেই।
ভূমিকম্প কি পাপের শাস্তি?
কোরআনের সূরা আর-রূমের ৪১ নম্বর আয়াতে মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে স্থল ও সমুদ্রে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়ার কথা বলা হয়েছে।
এই আয়াতের আলোকে অনেক ইসলামি চিন্তাবিদ প্রাকৃতিক দুর্যোগকে মানুষের জন্য সতর্কবার্তা ও আত্মসমালোচনার উপলক্ষ হিসেবে দেখেন।
তবে কোনো নির্দিষ্ট ভূমিকম্পকে কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর পাপের শাস্তি হিসেবে চিহ্নিত করা ঠিক নয়। কারণ একটি দুর্যোগ কারও জন্য পরীক্ষা, কারও জন্য সতর্কতা কিংবা অন্য কোনো আল্লাহর হিকমতের অংশ হতে পারে।
কেন এখন ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতি বেশি?
ভূমিকম্পের সংখ্যা অপরিবর্তিত থাকলেও ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা অনেক ক্ষেত্রে বেড়ে যেতে পারে। এর প্রধান কারণ দ্রুত নগরায়ণ, জনসংখ্যার ঘনত্ব এবং অপরিকল্পিত নির্মাণ।
একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প যদি জনবহুল এলাকায় আঘাত হানে এবং সেখানে ভবন নির্মাণের মান দুর্বল হয়, তাহলে প্রাণহানি ও আর্থিক ক্ষতি ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।
তুরস্ক-সিরিয়ার ভূমিকম্প কিংবা মরক্কোর ভয়াবহ ভূমিকম্প এই বাস্তবতার বড় উদাহরণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূমিকম্পে প্রাণহানি কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলোর মধ্যে রয়েছে—ভূমিকম্প সহনশীল ভবন নির্মাণ, বিল্ডিং কোড বাস্তবায়ন, পুরোনো ভবনের ঝুঁকি নিরূপণ এবং দ্রুত উদ্ধারব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
কেয়ামতের আরও কিছু আলামত নিয়েও আলোচনা
রাসুলুল্লাহ (সা.) কেয়ামতের পূর্ববর্তী বিভিন্ন আলামতের কথা বলেছেন। এর মধ্যে ইলম কমে যাওয়া, অজ্ঞতা বৃদ্ধি, হত্যা বৃদ্ধি এবং সামাজিক নানা পরিবর্তনের উল্লেখ রয়েছে।
বর্তমান বিশ্বের কিছু ঘটনা এসব বর্ণনার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ বলে অনেক মুসলিম মনে করেন। তবে ধর্মীয় বর্ণনার সঙ্গে সমসাময়িক ঘটনাকে মিলিয়ে কেয়ামত অত্যাসন্ন—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সঠিক নয়।
কারণ কোরআনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, কেয়ামতের জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর কাছেই।
বিজ্ঞান ও বিশ্বাস—দুটি দৃষ্টিভঙ্গি
ভূমিকম্পের বৈজ্ঞানিক কারণ ব্যাখ্যা করে ভূতত্ত্ব। টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়া, ভূগর্ভে চাপ সঞ্চয় এবং সেই চাপের আকস্মিক মুক্তিই ভূমিকম্পের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা।
অন্যদিকে ইসলাম মানুষকে প্রকৃতির এসব ঘটনাকে আল্লাহর সৃষ্টি ও ক্ষমতার নিদর্শন হিসেবে দেখার পাশাপাশি নিজের জীবন ও কাজ নিয়ে আত্মসমালোচনা করতে উৎসাহিত করে।
দুটি ব্যাখ্যাকে পরস্পরবিরোধী না ভেবেও দেখা সম্ভব। ভূমিকম্প কীভাবে ঘটে—বিজ্ঞান তার ব্যাখ্যা দেয়। আর একজন বিশ্বাসী মানুষ সেই ঘটনার সামনে কীভাবে নৈতিক ও আত্মিক প্রতিক্রিয়া জানাবেন—ইসলাম তার দিকনির্দেশনা দেয়।
আতঙ্ক নয়, প্রস্তুতি জরুরি
ভূমিকম্পকে কেন্দ্র করে আতঙ্ক ছড়ানো যেমন অনুচিত, তেমনি সম্ভাব্য ঝুঁকি উপেক্ষা করাও বিপজ্জনক।
বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে ভূমিকম্পের ঝুঁকি মোকাবিলায় ভবন নির্মাণে বিধিমালা কঠোরভাবে মানা, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করা, নিয়মিত ভূমিকম্প মহড়া, উদ্ধারকারী সংস্থার সক্ষমতা বাড়ানো এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
একই সঙ্গে ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তওবা, ইস্তিগফার, নামাজ, মানুষের অধিকার রক্ষা, জুলুম-অন্যায় থেকে বিরত থাকা এবং দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
তাহলে কি এটি কেয়ামতের আলামত?
হাদিসে কেয়ামতের আগে ভূমিকম্প বেড়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ থাকায় ভূমিকম্পের বৃদ্ধি কেয়ামতের ছোট আলামতগুলোর একটি হিসেবে ইসলামী ঐতিহ্যে বিবেচিত হয়।
তবে বর্তমান বিশ্বের ভূমিকম্পের পরিমাণ বা কোনো নির্দিষ্ট দুর্যোগকে দেখিয়ে কেয়ামত কতটা নিকটে—এমন সিদ্ধান্ত দেওয়ার সুযোগ নেই।
বিজ্ঞান বলছে, ভূমিকম্প পৃথিবীর স্বাভাবিক ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার অংশ। ইসলাম বলছে, এসব ঘটনা মানুষকে আল্লাহর ক্ষমতা, নিজের অসহায়ত্ব ও আখিরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দিতে পারে।
সুতরাং ভূমিকম্পকে ঘিরে ভয় বা গুজব নয়—প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক প্রস্তুতি, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং আত্মিক সচেতনতা।
কারণ একটি কয়েক সেকেন্ডের ভূমিকম্পই মানুষের গড়ে তোলা বহু বছরের স্থাপনা মুহূর্তে ধ্বংস করে দিতে পারে। আর সেই বাস্তবতা মনে করিয়ে দেয়—মানুষ যতই প্রযুক্তিতে এগিয়ে যাক, প্রকৃতির সামনে তার সীমাবদ্ধতা থেকেই যায়।
কেয়ামত কখন হবে, তা মানুষ জানে না। তাই কেয়ামতের তারিখ নির্ধারণের চেয়ে নিজের জীবনকে সৎ, দায়িত্বশীল ও মানবিক করে তোলাই হতে পারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতি।
দোয়া: "আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকাল আফিয়াহ।”
হে আল্লাহ, আমাদের এবং সমগ্র মানবজাতিকে সব ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে হেফাজত করুন। বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর তাওফিক দিন এবং আমাদের ভুলত্রুটি ক্ষমা করুন। আমিন।