মোঃ মিরাজ হোসেন , বরগুনা প্রতিনিধি
বয়সের ভাঁজে নুয়ে পড়েছে শরীর। দৃষ্টিতেও হয়তো একটু ঝাপসা ভাব। যে বয়সে বেশিরভাগ মানুষই পরিবারের সান্নিধ্যে বিশ্রামে দিন কাটান, সেই ৯৫ বছর বয়সেও নিজের ভাগ্যের চাকা সচল রেখেছেন রুস্তম আলী। বরগুনার এই প্রবীণ কৃষক প্রমাণ করেছেন— ইচ্ছা আর পরিশ্রমের কাছে বয়স কোনো বাধাই নয়। দেড় একর জমিতে `দেশি শাহী` জাতের পেঁপে চাষ করে তিনি সপ্তাহে আয় করছেন দুই হাজার টাকার বেশি, যা স্থানীয়দের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বরগুনা সদর উপজেলার সদর ইউনিয়নের আমতলী-নিমতলী এলাকায় গিয়ে দেখা মেলে এক বিরল দৃশ্যের। চুক্তিতে নেওয়া দেড় একর জমিতে রুস্তম আলী গড়ে তুলেছেন পেঁপের এক বিশাল বাগান। সেখানে সারিবদ্ধভাবে শোভা পাচ্ছে সাড়ে ৩০০টি দেশি শাহী জাতের পেঁপে গাছ।
সরেজমিনে বাগানে গিয়ে দেখা যায়, বয়সের ভারে শরীর কিছুটা নুয়ে পড়লেও সকাল থেকেই কর্মচঞ্চল রুস্তম আলী। কোনো গাছ হেলে পড়লে তা শক্ত বাঁশ দিয়ে সোজা করছেন, আবার কখনো নিড়ানি হাতে গাছের গোড়ার আগাছা পরিষ্কার করছেন নিজ হাতেই।
শুধু চাষাবাদই নয়, বাগান থেকে ফল তুলে তা নিজেই বরগুনা বাজারে নিয়ে বিক্রি করেন তিনি। রুস্তম আলী জানান, প্রতি সপ্তাহে পেঁপে বিক্রি করে খরচ বাদ দিয়ে তার নিট লাভ থাকে ২,০০০ থেকে ২,৫০০ টাকা। চলতি মৌসুমে বাগান থেকে অন্তত দুই লাখ টাকার পেঁপে বিক্রির আশা করছেন তিনি।
নিজের এই নিরলস পথচলা নিয়ে দ্যুতি ছড়ানো হাসিতে রুস্তম আলী বলেন, ‘কাজ করতে পারলে শরীর ও মন দুটোই ভালো থাকে। অলস বসে থেকে নিজের ক্ষতি করার কোনো মানে হয় না। তাই জমিতে পরিশ্রম করি, এতেই আমার আনন্দ।’
বাবার এই অদম্য স্পৃহা দেখে গর্বিত তাঁর ছেলে হাবুল হাওলাদার। তিনি বলেন, ‘আমার বাবার বয়স ৯৫ বছর হলেও কাজের দিক থেকে তিনি তরুণদের চেয়ে কম যান না। প্রতিদিন সকালে উঠে ফজর নামাজ আদায় করেই তিনি মাঠে চলে আসেন। সম্পূর্ণ নিজের প্রচেষ্টায় চুক্তিতে নেওয়া দেড় একর জমিতে সাড়ে ৩০০টি পেঁপে গাছ ফলিয়েছেন তিনি।’
৯৫ বছরের একজন বৃদ্ধের এমন অনন্য কৃষি সাফল্য নজরে এসেছে স্থানীয় কৃষি বিভাগেরও। এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বরগুনার অতিরিক্ত উপপরিচালক কৃষিবিদ সি এম রেজাউল করিম বলেন, ‘প্রবীণ কৃষক রুস্তম আলীর পেঁপে চাষের বিষয়টি অত্যন্ত প্রশংসনীয় এবং আমাদের নজরে এসেছে। তাঁর এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে তাঁকে সার্বিক প্রযুক্তিগত পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়া হবে।’
বার্ধক্যকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে রুস্তম আলীর এই নীরব বিপ্লব বরগুনাসহ আশপাশের অঞ্চলের মানুষের কাছে এক অনন্য সামাজিক দৃষ্টান্ত ও অনুকরণীয় প্রেরণা হয়ে দাঁড়িয়েছে।