সালাহউদ্দিন মিঠু
সাব-রেজিস্ট্রার! এই বাক্যটি শুনলেই সাধারণ মানুষ আতকে ওঠে। ঘুষ, দূর্নীতি আর হয়রানীর আতুর ঘর বলেই মনে করেন ভূক্তভোগীরা। নিজের ক্রয় করা হোক কিংবা বাপ দাদার উত্তরাধিকার, যেভাবেই ভুমির মালিকানা হোক সাব রেজিস্ট্রার কার্যালয় থেকে নামজারী করে নিজের মালিকানা নিশ্চিত করতে হয়। কিন্তু একাজটি করতে যেয়ে সাধারণ মানুষকে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। নানা নামে নানান নিয়মের নিয়মের আড়ালে সরকার নির্ধারিত অংেকের চেয়ে অতিরিক্ত অর্থের বোঝা বহন করতে হয় সাব- রেজিস্ট্রার অফিসে।
ভূমি মানুষের সবচেয়ে বড় ও নিরাপদ সম্পদ। আর সেই সম্পদের আইনি বৈধতা নিশ্চিত করার প্রথম এবং প্রধান দরজা হলো সাব-রেজিস্ট্রার অফিস। কিন্তু সাম্প্রতিক বাস্তবতায় সেই আস্থার জায়গাটিই সবচেয়ে বড় ভোগান্তির কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। দেশের প্রায় সব জেলা ও উপজেলায় সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষের একটাই অভিযোগ, নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত টাকা না দিলে কোনো কাজই সময়মতো হয় না।
দেশে বর্তমানে ৩৭২ জন সাব-রেজিস্ট্রার কর্মরত আছেন এবং ১৩৯টি পদ শূন্য পড়ে আছে। এই জনবল সংকটের সুযোগ নিয়ে একটি অসাধু চক্র গড়ে উঠেছে। বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জের মতো বড় ও ব্যস্ত অফিসগুলোকে প্রাইজ পোস্টিং হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এসব অফিসে বদলি বা পদায়নকে কেন্দ্র করে কোটি টাকার লেনদেনের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ফলে যিনি বেশি টাকা দিয়ে আসেন, তিনি সেই টাকা তোলার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন।
ভুমি অধিদফতরের উপ-মহানিবন্ধক আশরাফুল ইসলাম সাব রেজিস্ট্রার কার্যলয়ে অনিয়ম একেবারে তলানিতে নেমে এসেছে জানিয়ে বর্তমানদিনকে বলেন, জমিজমা সংক্রান্ত বিষয়ে কোন অনিয়ম ধরা পড়লে তাৎক্ষনিকভাবে ব্যাবস্থা গ্রহন করা হচ্ছে। কোথাও কোন অনিয়ম হলে ভুক্তভোগী জমির মালিক অভিযোগ করতে পারেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সাব-রেজিস্ট্রার অফিসগুলোতে বর্তমানে সম্পূর্ন ডিজিটাল পদ্ধতিতে কাজ হচ্ছে বিধায় অনিয়ম নেই বলেেলই চলে।
এই পরিস্থিতি সামাল দিতে আইন মন্ত্রণালয় সম্প্রতি একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে। ঢাকার সাব-রেজিস্ট্রারদের লটারির মাধ্যমে বদলি শুরু করা হয়েছে। প্রথম ধাপে ১৩১ জনের মধ্য থেকে ১৮ জনকে ঢাকার বিভিন্ন অফিসে পদায়ন করা হয়েছে। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই প্রক্রিয়া পর্যায়ক্রমে সারাদেশে চালু করা হবে এবং প্রতিটি অফিস ২৪ ঘণ্টা মনিটরিংয়ের আওতায় আনা হবে। গত ছয় মাসে ১০ জনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।
মাঠ পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে অনিয়মের কয়েকটি সাধারণ ধরন পাওয়া যায়। প্রথমত, জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে রাজস্ব ফাঁকি। এটি সবচেয়ে বড় দুর্নীতি। যেমন, নাল জমি অর্থাৎ ফসলি জমির সরকারি মূল্য ও রেজিস্ট্রেশন ফি অনেক বেশি। অসাধু কর্মকর্তারা যোগসাজশে সেই জমিকে কাগজে-কলমে পতিত বা ডোবা দেখিয়ে দেন। এতে জমির দলিল মূল্য কয়েক কোটি টাকা থেকে নেমে আসে কয়েক লাখ টাকায়। সরকার একদিকে বিশাল রাজস্ব হারায়, অন্যদিকে ক্রেতা-বিক্রেতা অবৈধ সুবিধা নেয়। বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জে এমন ঘটনার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে।
দ্বিতীয়ত, কাগজপত্র যাচাই না করে দলিল করা। নিয়ম অনুযায়ী, যেকোনো দলিল রেজিস্ট্রির আগে খতিয়ান, নামজারি, খাজনার রসিদ এবং মালিকানা ধারাবাহিকতা যাচাই করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু অনেক অফিসে এই যাচাই-বাছাই না করেই দলিল রেজিস্ট্রি করে দেওয়া হয়। কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে ৯৫ শতক জমির দলিলে ধর্মীয় উপকরণ বিনিময়ের কথা উল্লেখ করে রেজিস্ট্রির ঘটনায় এই অবহেলার প্রমাণ মেলে। এমন দলিল পরবর্তীতে পারিবারিক বিরোধ ও মামলা-মোকদ্দমার জন্ম দেয়।
তৃতীয়ত, সিন্ডিকেট ভিত্তিক ঘুষ আদায়। সাব-রেজিস্ট্রার একা এই কাজ করেন না। তার অফিসের মোহরার, প্রধান সহকারী, নকলনবিশ এবং বাইরের লাইসেন্সপ্রাপ্ত দলিল লেখকদের নিয়ে একটি চক্র কাজ করে। সেবাগ্রহীতা সরাসরি সাব-রেজিস্ট্রারের হাতে টাকা দেন না, টাকা যায় দলিল লেখকের মাধ্যমে। পরে তা ভাগ-বাঁটোয়ারা হয়। প্রতি হাজার টাকায় ৬ টাকা থেকে শুরু করে প্রতি দলিলে ৩ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত আদায়ের অভিযোগ বিভিন্ন জেলায় পাওয়া গেছে।
চতুর্থত, ইচ্ছাকৃত হয়রানি। টাকা দিতে অস্বীকার করলে ফাইলে অহেতুক আপত্তি তোলা হয়। দলিলের বানান ভুল, ছবি অস্পষ্ট, বা স্ট্যাম্প কম হয়েছে এমন অজুহাতে দিনের পর দিন ঘোরানো হয়। ফলে বাধ্য হয়ে সাধারণ মানুষ ঘুষের পথে যেতে বাধ্য হন।
অনিয়মের প্রভাব শুধু একটি অফিসে সীমাবদ্ধ নয়
এক, রাষ্ট্রীয় কোষাগারে বড় আঘাত। শ্রেণি পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রতিবছর শত শত কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি হচ্ছে বলে ধারণা করা হয়। দুই, ভূমি বিরোধ বৃদ্ধি। ভুয়া বা ত্রুটিপূর্ণ দলিলের কারণে একই জমি একাধিকবার বিক্রি হচ্ছে। এতে গ্রামে-গঞ্জে মারামারি, সংঘর্ষ এবং আদালতে মামলার জট বাড়ছে।
তিন, অবৈধ সম্পদের পাহাড়। এই দুর্নীতির টাকায় অনেক কর্মকর্তা শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। ঢাকার মিরপুরে কর্মরত থাকা একজন অবসরপ্রাপ্ত সাব-রেজিস্ট্রারের মাসিক অবৈধ আয় ৭০ থেকে ৮০ লাখ টাকা ছিল বলে দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। তার নামে-বেনামে বিপুল সম্পত্তির খোঁজ পাওয়া গেছে। শুধু বদলি বা শাস্তি দিয়ে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন সমন্বিত সংস্কার।
শতভাগ ডিজিটালাইজেশন : হাতে লেখা দলিলের পরিবর্তে ই-রেজিস্ট্রেশন চালু করতে হবে। জমির মৌজা মূল্য সরকারি সফটওয়্যারে আগে থেকেই নির্ধারিত থাকবে। ফলে কর্মকর্তা চাইলেও মূল্য কমাতে পারবেন না। ফি ক্যালকুলেশন হবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে।
অনলাইন পেমেন্ট: নগদ টাকার লেনদেন সম্পূর্ণ বন্ধ করে ব্যাংক বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ফি জমার ব্যবস্থা করতে হবে।
নাগরিকদের জন্য তথ্য সহজলভ্য করা: প্রতিটি অফিসের সামনে বড় বোর্ডে সরকারি ফির তালিকা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের তালিকা এবং অভিযোগের নম্বর প্রদর্শন করতে হবে।
সিসিটিভি ও বডি ক্যামেরা: প্রতিটি রেজিস্ট্রি কক্ষে সিসিটিভি এবং কর্মকর্তাদের জন্য প্রয়োজনে বডি ক্যামেরা চালু করা যেতে পারে। ফুটেজ মন্ত্রণালয় থেকে সরাসরি মনিটরিং করা হবে।
দলিল লেখকদের নিয়ন্ত্রণ: লাইসেন্সপ্রাপ্ত দলিল লেখকদের জন্য নির্দিষ্ট ফি নির্ধারণ করে দেওয়া এবং তাদের কাজের মান মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা।
দ্রুত শূন্য পদ পূরণ: ১৩৯টি শূন্য পদ দ্রুত পূরণ করে একজন কর্মকর্তার ওপর অতিরিক্ত চাপ কমানো। একজন কর্মকর্তা একই স্থানে ২ বছরের বেশি থাকতে পারবেন না, এই নীতি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা।
সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের দুর্নীতি একটি প্রশাসনিক সমস্যা নয়, এটি সামাজিক ন্যায়বিচারের সমস্যা। একজন কৃষক তার সারাজীবনের সঞ্চয় দিয়ে এক টুকরো জমি কেনেন, আর সেই জমির বৈধতা পেতে যদি তাকে আবার ঘুষ দিতে হয়, তাহলে রাষ্ট্রের প্রতি তার আস্থা থাকে না। লটারিতে বদলি একটি ভালো শুরু, কিন্তু এই শুরুকে শেষ পর্যন্ত নিয়ে যেতে হলে প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কঠোর জবাবদিহি নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।
বর্তমানদিন/ফআ