বুধবার, অক্টোবর ২৮, ২০২৬
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
শিরোনাম :

   বিশেষ সংবাদ
জবাবদিহিতার সংকটে আবাসন খাত
  Date : 28-10-2026
Share Button

সালাহউদ্দিন মিঠু

দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান খাত আবাসন শিল্প। নানান অনিয়মের কারনে এই খাত এখন চরম সংকটময় পরিস্থিতি পার করছে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ এই খাতের উপর নির্ভরশীল এই খাতে গত দুই বছরে এক ধরনের স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। জিডিপিতে এই খাতের অবদান প্রায় ৮ শতাংশ। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে এঅবস্থার স্থিতিশীলতা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বাংলাদেশের আবাসন খাত দীর্ঘ সময় ধরে নানাবিধ অনিয়ম, দুর্নীতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার অভাবে সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে। আবাসন পরিদপ্তর ও জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের মতো সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থা থেকে শুরু করে বেসরকারি ডেভেলপার কোম্পানিগুলোর বিভিন্ন স্তরে দুর্নীতির অভিযোগ নিত্যদিনের ঘটনা।

বাংলাদেশের আবাসন খাতে দুর্নীতি, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা দীর্ঘদিনের সমস্যা, যা সাধারণ মানুষের সাশ্রয়ী মূল্যে বাসস্থান পাওয়ার অধিকারকে বাধাগ্রস্ত করছে। খাস জমি বা সরকারি সম্পত্তি দখল করে অবৈধভাবে বহুতল ভবন বা বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ প্রায়ই পাওয়া যায়। রাজউক বা অন্যান্য কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত নকশা না মেনে বা আইন লঙ্ঘন করে যত্রতত্র আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলা হচ্ছে। জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ বা বিভিন্ন সরকারি আবাসন প্রকল্পের কাজে দুর্নীতির মাধ্যমে বরাদ্দ আত্মসাৎ ও নিম্নমানের কাজের অভিযোগ রয়েছে। আবাসন বাজার মূলত মুনাফাখোরদের নিয়ন্ত্রণে থাকায় সাধারণ ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য নিরাপদ আবাসন পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।

বর্তমান সরকার আবাসন খাতকে টেকসই, বিনিয়োগবান্ধব ও দুর্নীতিমুক্ত করতে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অনিয়ম রোধ করতে আবাসন ও ভূমি-সংশ্লিষ্ট সরকারি সেবাগুলো পুরোপুরি ডিজিটাল করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। নিম্ন আয়ের মানুষ ও বস্তিবাসীদের আবাসন সংকট নিরসনে সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান ও নতুন উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে।

বর্তমানে আবাসন খাতে ৫টি বড় সমস্যা দেখা দিয়েছে। প্রথম সমস্যা হলো ফ্ল্যাট বিক্রি কমে যাওয়া। গত অর্থবছরে ঢাকায় ফ্ল্যাট বিক্রি কমেছে ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ। ২০২৩ সালে ঢাকায় প্রায় ১২ হাজার ফ্ল্যাট বিক্রি হলেও ২০২৫ সালে তা নেমে এসেছে ৭ হাজারের নিচে। এর প্রধান কারণ হলো ব্যাংক ঋণের সুদের হার বেড়ে যাওয়া। আগে হোম লোনের সুদ ছিল ৯ শতাংশ, এখন তা ১১ থেকে ১৪ শতাংশ। ফলে মধ্যবিত্ত শ্রেণির ক্রেতারা ফ্ল্যাট কিনতে আগ্রহ হারাচ্ছেন। অনেকে বুকিং দিয়েও কিস্তি পরিশোধ করতে পারছেন না।

দ্বিতীয় সমস্যা হলো নির্মাণ ব্যয় বেড়ে যাওয়া। গত তিন বছরে নির্মাণ ব্যয় বেড়েছে ৪৫ শতাংশ। রডের দাম প্রতি টনে ৭২ হাজার থেকে বেড়ে ১ লাখ টাকা হয়েছে। সিমেন্টের বস্তা ৪২০ থেকে বেড়ে ৬২০ টাকা হয়েছে। ইটের হাজার ৯ হাজার থেকে ১৪ হাজার টাকা হয়েছে। শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ৬৫০ থেকে বেড়ে ৯০০ টাকা হয়েছে। ফলে প্রতি বর্গফুটে নির্মাণ খরচ ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা বেড়েছে। এই বাড়তি খরচ ক্রেতার উপর চাপ তৈরি করছে।

তৃতীয় সমস্যা হলো আস্থার সংকট। ঢাকার আশপাশে অনেক কোম্পানি রাজউকের অনুমোদন ছাড়া প্রকল্প ঘোষণা করে প্লট বিক্রি করছে। একই প্লট একাধিক ব্যক্তির কাছে বিক্রি, সময় মতো ফ্ল্যাট বুঝিয়ে না দেওয়া, কাগজপত্রে জটিলতা - এসব কারণে ক্রেতারা প্রতারিত হচ্ছেন। গত এক বছরে আবাসন প্রতারণা সংক্রান্ত ৩৪০টি মামলা হয়েছে। এর ফলে ভালো কোম্পানিগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

চতুর্থ সমস্যা হলো ড্যাপ ও ইমারত বিধিমালার প্রভাব। নতুন ড্যাপে অনেক এলাকায় ফার কমে যাওয়ায় ভবনের উচ্চতা কমেছে। আগে ৫ কাঠা জমিতে ১৮টি ফ্ল্যাট করা গেলেও এখন ১২ থেকে ১৪টি করা যাচ্ছে। ফলে জমির মালিক ও ডেভেলপার উভয়ের লাভ কমেছে। অনেক প্রকল্প অনুমোদনের জটিলতায় আটকে আছে।

পঞ্চম সমস্যা হলো ঢাকা কেন্দ্রিকতা। দেশের আবাসন ব্যবসার ৮০ শতাংশই ঢাকা কেন্দ্রিক। ঢাকার বাইরে পরিকল্পিত আবাসন গড়ে ওঠেনি। প্রতিবছর ঢাকায় ৫ লাখ নতুন মানুষ আসছে। কিন্তু পূর্বাচল, ঝিলমিল, উত্তরা তৃতীয় পর্বের মতো প্রকল্প এখনো পুরোপুরি বসবাস উপযোগী হয়নি। সেখানে গ্যাস, পানি, রাস্তা, স্কুল, হাসপাতাল ও নিরাপত্তার অভাব রয়েছে।

এই অবস্থা থেকে বের হতে হলে কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি। মধ্যবিত্তের জন্য সিঙ্গেল ডিজিট সুদে হোম লোন চালু করা প্রয়োজন। ক্রেতার টাকা সুরক্ষায় এসক্রো সিস্টেম চালু করা দরকার, যাতে ক্রেতার টাকা একটি নির্দিষ্ট ব্যাংক হিসাবে জমা থাকবে এবং নির্মাণের অগ্রগতি অনুযায়ী টাকা ছাড় হবে। অনুমোদনহীন প্রকল্প বন্ধে রাজউক ও রিহ্যাবের যৌথ মনিটরিং জোরদার করতে হবে। নির্মাণ সামগ্রীর উপর শুল্ক কমিয়ে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। ঢাকার পাশে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সিগঞ্জে পরিকল্পিত স্যাটেলাইট সিটি গড়ে তুলতে হবে। আবাসন শিল্প মানুষের স্বপ্নের সাথে জড়িত। একটি ফ্ল্যাট মানে একটি পরিবারের সারাজীবনের সঞ্চয়। এই শিল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে পুরো অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বর্তমানে এই শিল্প পুরোপুরি সঠিক পথে নেই, তবে সঠিক নীতি ও সরকারি সহযোগিতা পেলে এই খাত আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে।

 

বর্তমানদিন/ফআ



  
  সর্বশেষ
বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর
সোনার দাম ভরিতে বাড়ল ২ হাজার ২১৬ টাকা
মালয়েশিয়াগামী কর্মীদের ৩১ অক্টোবর থেকে স্বাস্থ্য পরীক্ষা শুরু
কমল স্বর্ণের দাম

প্রধান সম্পাদক: মতিউর রহমান , সম্পাদক: জাকির হোসেন, নির্বাহী সম্পাদক এসএম আবুল হাসান। সম্পাদক কর্তৃক ২ আরকে মিশন রোড, ঢাকা ১২০৩ থেকে প্রকাশিত এবং বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস ২০১৯ ফকিরাপুল , ঢাকা ১০০০ থেকে মুদ্রিত। বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: জামান টাওয়ার (৪র্থ তলা) ৩৭/২ পুরাণা পল্টন, ঢাকা ১০০০
ফোন: ০১৫৫৮০১১২৭৫, ০১৭১১১৪৫৮৯৮, ০১৭২৭২০৮১৩৮। ই-মেইল: bortomandin@gmail.com, ওয়েবসাইট: bortomandin.com