২৪ জেলার অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তনের আশা, বাড়বে কৃষি-উৎপাদন ও বিদ্যুৎ
আগামী বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণকাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান—এমনটাই জানিয়েছেন পানিসম্পদমন্ত্রী মো. শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি। তাঁর মতে, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের দক্ষিণ, পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চলের ২৪ জেলার কৃষি, মৎস্য, নৌপরিবহন ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে।
শুক্রবার দুপুরে রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার হাবাসপুরে প্রস্তাবিত পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণস্থল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে পানিসম্পদমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, ‘অর্থনৈতিক রূপান্তর ও অর্থনৈতিক বিপ্লবের জন্য পদ্মা ব্যারেজ একটি মাস্টারমাইন্ড মেগা প্রকল্প।’ এটি বাস্তবায়িত হলে ২৪ জেলার অর্থনীতিতে পরিবর্তন আসবে। কৃষিতে বিপ্লব ঘটবে, বাড়বে মাছের উৎপাদন ও বিদ্যুৎ উৎপাদন। পাশাপাশি নদী ব্যবস্থাপনা, সেচ ও পানিসম্পদের ব্যবহারেও নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল এবং তা নির্বাচনী ইশতেহারেও অন্তর্ভুক্ত ছিল। এখন সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে। এজন্য পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট ২৪ জেলার পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান তিনি।
৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকার প্রকল্প
সরকারের অনুমোদিত প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা। পুরো অর্থায়ন হবে সরকারি তহবিল থেকে এবং প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সময় ধরা হয়েছে সাত বছর—২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩৩ সালের জুন পর্যন্ত।
প্রকল্পের আওতায় পাংশা এলাকায় পদ্মা নদীর ওপর প্রায় ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ ব্যারেজ নির্মাণ করা হবে। এতে থাকবে ৭৮টি স্পিলওয়ে গেট, ১৮টি আন্ডার-স্লুইস গেট, নেভিগেশন লক ও মাছ চলাচলের জন্য ফিশ পাস। ব্যারেজের ওপর একটি রেলসেতু নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২৯০ কোটি ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করে শুষ্ক মৌসুমে বিভিন্ন নদী ব্যবস্থায় নিয়ন্ত্রিত পানি সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে সেচ সুবিধা বাড়ানোর পাশাপাশি নদীর নাব্যতা, মিঠাপানির প্রবাহ এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখার আশা করা হচ্ছে।
বাড়বে কৃষি ও মাছের উৎপাদন
পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট মোকাবিলা এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদী ব্যবস্থায় পানির প্রবাহ বাড়ানো। প্রকল্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এর আওতায় বৃহত্তর কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, বরিশাল, পাবনা ও রাজশাহী অঞ্চলে সেচ সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে। এতে কৃষি উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি মৎস্য খাতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা।
প্রকল্পের নকশায় জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। এ খাতে ১১৩ মেগাওয়াট সক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কথা বলা হয়েছে। সাম্প্রতিক বক্তব্যে মন্ত্রী প্রকল্পের আওতায় দুটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের কথা উল্লেখ করেছেন।
নদীভাঙন ও লবণাক্ততা মোকাবিলায় ভূমিকা
বর্ষা মৌসুমে পদ্মা ও সংশ্লিষ্ট নদীগুলোতে পানির প্রবাহ ও নদীভাঙন এবং শুষ্ক মৌসুমে পানির স্বল্পতা—দুই ধরনের সমস্যাই দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের জীবন ও কৃষিতে প্রভাব ফেলে। পদ্মা ব্যারেজের মাধ্যমে পানি নিয়ন্ত্রণ ও সংরক্ষণ করে শুষ্ক মৌসুমে প্রয়োজনীয় নদী ব্যবস্থায় পানি সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে।
পানিসম্পদমন্ত্রীও বলেছেন, প্রকল্পটি বর্ষায় নদীভাঙন ও বন্যার ক্ষতি কমাতে এবং শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট ও লবণাক্ততা মোকাবিলায় ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে সুন্দরবনের প্রতিবেশব্যবস্থা রক্ষায়ও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।
তবে প্রকল্পটির কার্যকারিতা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে কিছু প্রশ্নও রয়েছে। বিশেষ করে উজান থেকে পানির প্রবাহ, আন্তঃসীমান্ত নদীর পানি ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশগত প্রভাব প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
দুই দশকের অপেক্ষার পর বাস্তবায়নের পথে
পদ্মা ব্যারেজের কারিগরি সমীক্ষার কাজ শুরু হয়েছিল ২০০৪ সালে। দীর্ঘ সময়ের পরিকল্পনা ও আলোচনার পর ২০২৬ সালে প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি—একনেকে অনুমোদন পায়।
শুক্রবার হাবাসপুরে প্রকল্পের প্রস্তাবিত স্থান পরিদর্শনের সময় পানিসম্পদমন্ত্রীর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম এবং রাজবাড়ী-২ আসনের সংসদ সদস্য হারুন অর রশিদসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
পরে হাবাসপুর কে রাজ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে স্থানীয় বিএনপির আয়োজনে অনুষ্ঠিত জনসভায় বক্তব্য দেন পানিসম্পদমন্ত্রী।
পদ্মা ব্যারেজ বাস্তবায়িত হলে শুধু একটি ব্যারেজ নির্মাণই নয়—দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষি, মৎস্য, নৌপরিবহন ও বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হবে। সরকারের প্রত্যাশা, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে বহুদিনের পানিসংকট মোকাবিলার পাশাপাশি বৃহৎ একটি অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি আসবে।