শাহীন আবদুল বারী
নতুন ধরণের মাদকদ্রব্য উদ্ধার ও আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালান চক্রের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক সফল অভিযানের স্বীকৃতি হিসেবে পুরস্কৃত হয়েছেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) উপপরিচালক মো. মেহেদী হাসান।
শুক্রবার (২৬ জুন) ‘মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস’ উপলক্ষে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ তার হাতে পুরষ্কার তুলে দেন।
দীর্ঘদিন ধরে মাদকবিরোধী অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসা এই কর্মকর্তা নতুন ধরনের মাদক শনাক্ত, আন্তর্জাতিক চোরাচালান চক্রের নেটওয়ার্ক উন্মোচন ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ দমনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছেন। এর মধ্যে গত ১০ ডিসেম্বর ঢাকা বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. মেহেদী হাসানের নেতৃত্বে পরিচালিত এক অভিযানে দেশে প্রথমবারের মতো মালয়েশিয়া থেকে আসা নতুন ধরণের মাদক ‘এমডিএমবি’-এর একটি চালান জব্দ করা হয়। একই অভিযানে মাদক চক্রের মূলহোতাসহ সংশ্লিষ্ট সব সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এর আগে, ২০১৬ সালের ২৫ মার্চ তার নেতৃত্বে ঢাকা বিভাগের গোয়েন্দা দল রাজধানীর উত্তরা এলাকায় অভিযান চালিয়ে আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালান চক্রের একটি আধুনিক ল্যাবরেটরি শনাক্ত করে। ওই অভিযানে ৬.৩ কেজি কেটামিন জব্দ করা হয় ও তিন বিদেশি নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়। একই সঙ্গে ডার্ক ওয়েব ও ক্রিপ্টোকারেন্সিভিত্তিক মাদক লেনদেনের একটি নেটওয়ার্কেরও সন্ধান পাওয়া যায়, যা সে সময় দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন হিসেবে বিবেচিত হয়।
এদিন মোট চার ক্যাটাগরিতে ডিএনসি কর্মকর্তাদের পুরস্কৃত করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এরমধ্যে ‘সাহসিকতা’য় পুরস্কার পেয়েছেন ডিএনসির ঢাকা মেট্রো. দক্ষিণ কার্যালয়ের পরিদর্শক সিদ্দিকুর রহমান। গত ২ মার্চ রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় অভিযানে গিয়ে মাদক কারবারিদের গুলিতে আহত হয়েছিলেন তিনি।
এছাড়া বুদ্ধিমত্তার সাথে মাদক উদ্ধারের জন্য ঢাকা মেট্রো. দক্ষিণ কার্যালয়ের ডেমরা সার্কেলের পরিদর্শক ফজলুল হক খান ও সর্বাধিক মানি লন্ডারিং মামলা দায়ের ও তদন্তের জন্য পুরস্কার পান ডিএনসির অতিরিক্ত পরিচালক আলী আসলাম।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণে এসব অবদান ও নতুন ধরণের মাদকদ্রব্য উদ্ধারে অসামান্য সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ উপপরিচালক মো. মেহেদী হাসানসহ ডিএনসির উক্ত ৩ কর্মকর্তাকে পুরষ্কৃত করা হয়। অন্যদিকে মাদক প্রতিরোধে সচেতনতামূলক কার্যক্রমে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ দুটি পুরস্কার অর্জন করেছে ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন।
ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের স্বাস্থ্য সেক্টরের পরিচালক ইকবাল মাসুদ এবং আহ্ছানিয়া মিশন মাদকাসক্তি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্র (যশোর)-এর ম্যানেজার মিজানুর রহমানের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর জানায়, বিজ্ঞানভিত্তিক মাদক প্রতিরোধ কার্যক্রমে বিশেষ অবদানের জন্য আহ্ছানিয়া মিশনের যশোর কেন্দ্র এবং জাতীয় মাদকবিরোধী র্যালিতে বর্ণাঢ্য অংশগ্রহণের স্বীকৃতিস্বরূপ ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনকে এ দুটি পুরস্কারের জন্য মনোনীত করা হয়েছে।
এসময় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মঞ্জুর মোর্শেদ চৌধুরী ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হাসান মারুফসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
প্রসঙ্গত, ১৯৯০ সাল থেকে ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন দেশে মাদক প্রতিরোধ, বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসা এবং পুনর্বাসন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি গাজীপুর, মুন্সিগঞ্জ ও যশোরে পুরুষদের জন্য এবং ঢাকায় নারীদের জন্য মাদকাসক্তি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্র পরিচালনা করছে।
এদিকে, তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় দৈনিক বর্তমান দিনকে মেহেদী বলেন, "এই অর্জন শুধু আমার একার নয়; এটি আমার টিমের সহকারী পরিচালকসহ সকল সদস্যের নিরলস পরিশ্রম, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের—বিশেষ করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মহোদয়ের সঠিক দিকনির্দেশনা এবং সংশ্লিষ্ট সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফসল।
তিনি বলেন, গত এক বছরে কয়েকটি আলোচিত মাদকবিরোধী অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ আমার হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—উত্তরা থেকে বিদেশি নাগরিকদের সম্পৃক্ত "ল্যাবসহ কিটামিন" মাদকের একটি বড় চালান জব্দ , দেশে নতুন ধরনের মাদক MDMB শনাক্ত ও জব্দ, বসুন্ধরা এলাকায় ভেজাল মদ তৈরির কানা এবং ওয়ারী এলাকায় বিদেশ থেকে নিয়ন্ত্রিত একটি কুশ (Kush) মাদক ল্যাবের সন্ধান। এসব অভিযানের মাধ্যমে আমরা শুধু অপরাধীদের আইনের আওতায় আনিনি; বরং নতুন ধরনের মাদকের বিস্তার সম্পর্কে রাষ্ট্র ও সমাজকে সময়মতো সতর্ক করারও সুযোগ পেয়েছি।
তবে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি—শুধু অভিযান, গ্রেপ্তার কিংবা মামলা দিয়ে মাদকের সমস্যা সম্পূর্ণ নির্মূল করা সম্ভব নয়। এই সংকট মোকাবিলায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পাশাপাশি সমগ্র সমাজকেও ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসতে হবে। পরিবারকে আরও সচেতন হতে হবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে, গণমাধ্যমকে তথ্যভিত্তিক জনসচেতনতা গড়ে তুলতে হবে, ধর্মীয় ও সামাজিক নেতাদের সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত হতে হবে এবং সর্বোপরি তরুণদের নিজেদের ভবিষ্যৎ রক্ষায় মাদকের বিরুদ্ধে সচেতন হতে হবে।
তিনি আরও বলেন, একই সঙ্গে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে আধুনিক প্রযুক্তি, অত্যাধুনিক অনুসন্ধান ও ফরেনসিক যন্ত্রপাতি এবং দক্ষ মানবসম্পদ দিয়ে আরও শক্তিশালী ও সক্ষম করে গড়ে তোলা জরুরি এবং বর্তমান সরকার সে লক্ষে কাজ করে যাচ্ছে। কারণ, প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত মাদকের ধরন ও পাচার কৌশল মোকাবিলায় প্রযুক্তিনির্ভর সক্ষমতাই হবে সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার।
এই প্রতিবেদকের সাথে আলাপচারিতার শেষ পর্যায়ে মেহেদী বলেন, মাদকবিরোধী লড়াই কোনো একক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়; এটি আমাদের সবার দায়িত্ব। একটি সুস্থ, নিরাপদ ও মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে রাষ্ট্র, সমাজ এবং প্রতিটি নাগরিকের সম্মিলিত অংশগ্রহণই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। আজকের এই স্বীকৃতি আমাদের আরও নিষ্ঠা, সততা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দেশের সেবায় কাজ করে যাওয়ার অনুপ্রেরণা জোগাবে।