নিজস্ব প্রতিবেদক
মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতকে কেন্দ্র করে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা বেড়েছে। এতে সরবরাহ বিঘ্ন ও দামের ওঠানামার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এই পরিবর্তনের ফলে আমদানিকারকদের আরও দূরের উৎস থেকে এলপিজি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। সেইসঙ্গে স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে এবং পণ্য কেনার বাড়তি প্রিমিয়াম, পরিবহন ও বিমা ব্যয় বহন করতে হচ্ছে।
দেশে প্রায় এক কোটি গ্রাহক মূলত রান্নার কাজে এলপিজি ব্যবহার করেন। বাড়তি আমদানির ব্যয়ের প্রভাব এসে পড়ছে স্থানীয় বাজারদরেও।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশের মোট এলপিজি আমদানির ৮৫ শতাংশ এসেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে। এক বছর আগে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে এ হার ছিল ২৭ দশমিক ৪ শতাংশ।
অন্যদিকে, ওমান, ইরাক, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে সেপ্টেম্বরে আমদানি শূন্যে নেমে এসেছে। অথচ গত বছরের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশের মোট এলপিজি আমদানির ৪১ শতাংশ এসেছিল ওমান থেকে আর ২১ শতাংশ ইরাক থেকে।
যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও কঙ্গো প্রজাতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র থেকে অল্প পরিমাণ এলপিজি এসেছে। দেশ দুটি মিলে মোট আমদানির ১২ শতাংশ জুগিয়েছে। মালয়েশিয়া থেকে আমদানি করা এলপিজির পরিমাণ ৫ শতাংশ থেকে কমে ৩ শতাংশ হয়েছে।
ওমেরা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের পরিচালক এবং এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এলওএবি) সাবেক সভাপতি আজম জে চৌধুরী বলেন, মধ্যপ্রাচ্য সংকটের আগে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরাসরি এলপিজি আনার পরিবহন ব্যয় ছিল প্রতি টনে প্রায় ৮২ ডলার। এখন কিছু জাহাজমালিক প্রতি টনে ২৫০ ডলার পর্যন্ত দাবি করছেন।
জেএমআই এলপিজির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ নুরুল আলম বলেন, তার প্রতিষ্ঠান প্রায় ৮ হাজার টন এলপিজি আমদানি করেছে। সরবরাহ নিশ্চিত করতে সৌদি কন্ট্রাক্ট প্রাইসের (সিপি) চেয়ে প্রতি টনে ৩০০ থেকে ৩৫০ ডলার বেশি প্রিমিয়াম দিতে হয়েছে। তিনি বলেন, ‘সরবরাহ অব্যাহত রাখতে আমরা লোকসানে পণ্য বিক্রি করছিলাম।’ নুরুল আলমের ভাষ্য, সংঘাতের কারণে জাহাজের প্রাপ্যতা কমেছে। ফলে এলপিজি পরিবহনের জন্য জাহাজের ব্যবস্থা করা এবং বিমা সুবিধা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এতে বাংলাদেশে এলপিজি আনার খরচও বেড়েছে।
আজম সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা এলপিজির ওপর বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা সরবরাহ নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি করছে। কারণ, আমদানিকারকদের বিকল্প উৎস সীমিত।
নাইজেরিয়া ও আলজেরিয়ার মতো দেশ বিকল্প সরবরাহকারী হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে বাংলাদেশের আমদানিকারকদের এসব বাজার থেকে এলপিজি সংগ্রহের অভিজ্ঞতা খুব কম বলে জানান তিনি। পরিবর্তিত সরবরাহব্যবস্থার কারণে এশিয়ায় মধ্যবর্তী সংরক্ষণাগার ও বাণিজ্যকেন্দ্রগুলোর ভূমিকা বাড়ছে।
আজম বলেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা এলপিজির চালান বাংলাদেশে পৌঁছানোর আগে কখনো কখনো ভিয়েতনাম, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও চীনের সংরক্ষণাগারে রাখা হয় এবং সেখান থেকে কেনাবেচা হয়। তিনি আরও বলেন, ভারতসহ বড় আমদানিকারক দেশগুলো আগামী তিন থেকে চার বছরের জন্য প্রয়োজনীয় চালান আগেই নিশ্চিত করেছে। ফলে বাংলাদেশের মতো অপেক্ষাকৃত ছোট দেশের জন্য সরবরাহ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, ‘যুদ্ধ শেষ হলেও সরবরাহ সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিক নাও হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো মেরামতে সময় লাগবে।’
দেশের এলপিজি খাতে একসম বড় অংশীদারত্ব থাকলেও বর্তমানে আমদানি বন্ধ রয়েছে বসুন্ধরা এলপি গ্যাস লিমিটেডের। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (বিক্রয় ও বিপণন) মো. রেদওয়ানুর রহমান বলেন, ‘দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি থাকা সত্ত্বেও জাহাজ চলাচলে সীমাবদ্ধতার কারণে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো চুক্তি অনুযায়ী পুরো পণ্য পাচ্ছিল না।’ তিনি জানান, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে ব্যাংকিং বিধিনিষেধের মুখে পড়ে তাদের প্রতিষ্ঠান। এরপর এখনো কোনো বৈশ্বিক সরবরাহকারীর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি নতুন চুক্তি করতে পারেনি বসুন্ধরা।
বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সরবরাহ বাড়ায় বাংলাদেশে এলপিজিবাহী জাহাজের যাত্রাপথ দীর্ঘ হয়েছে। এতে পরিবহনে সময় ও ব্যয়—দুটিই বেড়েছে।
এ খাতে প্রায় ৩৫টি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা পরিচালনার লাইসেন্স থাকলেও সক্রিয় আমদানিকারক আছেন মাত্র ১০ থেকে ১২টি। বিইআরসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশে মোট ১৭ লাখ ৪৩ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। এর প্রায় ৭১ শতাংশই এনেছে শীর্ষ পাঁচ আমদানিকারক। সবচেয়ে বেশি ২ লাখ ৯৬ হাজার টন এলপিজি আমদানি করেছে ইউনাইটেড আইগ্যাস। এরপর মেঘনা গ্রুপের ফ্রেশ এলপিজি এনেছে ২ লাখ ৮০ হাজার টন। ওমেরা আমদানি করেছে ২ লাখ ৬৫ হাজার টন, বিএম এনার্জি ২ লাখ ৩ হাজার টন এবং যমুনা স্পেসটেক ১ লাখ ৮৭ হাজার টন।
জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বসুন্ধরা, ইউনিটেক্স, ওরিয়ন, বেক্সিমকো ও জেএমআইসহ আরও কয়েকটি শীর্ষ প্রতিষ্ঠান আমদানি কমিয়েছে অথবা বন্ধ রেখেছে।
বর্তমানদিন/ফআ