পুরান ঢাকার মানুষদের মাতৃভাষা সাধারণত "ঢাকাইয়া উর্দু" । তবে, পুরান ঢাকার ভাষাগত প্রেক্ষাপট বেশ সমৃদ্ধ এবং বৈচিত্র্যময়, তাই একক ভাষায় নির্ধারণ করা একটু জটিল। মূলত পুরান ঢাকার মানুষদের মাতৃভাষার মধ্যে কয়েকটি প্রধান ধারা রয়েছে:
ঢাকাইয়া উর্দু (Dhakaiya Urdu):
মূল বৈশিষ্ট্য: ঢাকাইয়া উর্দু হলো পুরান ঢাকার মুসলিম সম্প্রদায়ের একটি বিশেষ ভাষা, যা প্রমিত উর্দু থেকে অনেকটাই আলাদা এবং এতে বাংলা, ফারসি, আরবি ও স্থানীয় শব্দের মিশ্রণ রয়েছে।
ব্যবহার: পুরান ঢাকার বিশেষত নবাব পরিবারের সদস্য এবং তাদের অনুসারী সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যাপক প্রচলিত।
সংস্কৃতিগত প্রভাব: এই ভাষায় পুরান ঢাকার নিজস্ব রীতি-নীতি, খাদ্য সংস্কৃতি, সংগীত এবং সাহিত্য প্রতিফলিত হয়।
ঢাকাইয়া বাংলা ভাষা (Dhakaiya Bangla/Bengali):
মূল বৈশিষ্ট্য: পুরান ঢাকার হিন্দু, বাঙালি মুসলিম এবং অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষের মাতৃভাষা মূলত বাংলা।
উপভাষা: এখানে ব্যবহৃত বাংলার বিশেষ একটি উপভাষা হলো "ঢাকাইয়া বাংলা" বা "পুরান ঢাকার বাংলা", যেখানে স্থানীয় কথ্যরীতি ও শব্দের প্রভাব স্পষ্ট। অনেকের মতে এই উপভাষা কে ঢাকাইয়া কুট্টি ভাষাও বলে।
আরবি, ফারসি ও ফার্সি-উর্দু প্রভাব:
• ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে ঢাকায় আগত ব্যবসায়ী, সুফি-সন্ত ও অভিজাতদের মাধ্যমে আরবি, ফারসি ও উর্দুর প্রভাব দেখা যায়।
• মাদ্রাসা শিক্ষা এবং ধর্মীয় রীতি-নীতির কারণে আরবি ভাষার কিছু প্রভাব থাকলেও এটি দৈনন্দিন ভাষায় নয়, বরং ধর্মীয় প্রসঙ্গে ব্যবহৃত হয়।
কেন ভাষাগত বৈচিত্র্য রয়েছে?
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: মুঘল আমল থেকে শুরু করে ব্রিটিশ এবং পাকিস্তান আমলে ঢাকায় নানা সম্প্রদায়ের মানুষের আগমন ঘটে।
বাণিজ্য ও সংস্কৃতি: পুরান ঢাকা একটি ব্যবসায়িক কেন্দ্র ছিল, যেখানে বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের উপস্থিতি ছিল।
নবাব পরিবারের প্রভাব: নবাব পরিবারের মাধ্যমে ঢাকাইয়া উর্দু ভাষা ও সংস্কৃতির প্রসার ঘটে।
মুক্তিযুদ্ধ ও অভিবাসন: ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং এর পরবর্তী সময়ে অনেক উর্দুভাষী মানুষ দেশত্যাগ করায় ভাষার প্রভাব কিছুটা কমে আসে।
বর্তমান পরিস্থিতি:
নবীন প্রজন্মের মধ্যে অনেকেই বাংলা বা ইংরেজি ব্যবহারে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে, ফলে ঢাকাইয়া উর্দুর প্রচলন কিছুটা কমে গেছে।
তবে নবাব পরিবার এবং কিছু ঐতিহ্যবাহী পরিবার এখনো ঢাকাইয়া উর্দু ভাষার চর্চা করে যাচ্ছেন।
পুরান ঢাকার মানুষের মাতৃভাষার মধ্যে প্রধানত ঢাকাইয়া উর্দু এবং বাংলা ভাষার উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। পুরান ঢাকার ঐতিহ্য এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের জন্যই এখানকার ভাষাগত পরিবেশ এত সমৃদ্ধ। ভাষার এই বৈচিত্র্য পুরান ঢাকার মানুষের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি এবং সামাজিক বন্ধনকে আরও মজবুত করে তোলে।