সোমবার, অক্টোবর ১৯, ২০২৬
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
শিরোনাম :

   জাতীয়
ইশরাক হোসেনকে নিয়ে যত নাটক
  Date : 19-10-2026
Share Button

নিজস্ব প্রতিবেদক

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন কেন্দ্রিক রাজনীতিতে গত ছয় বছরে সবচেয়ে বেশি আলোচিত নাম ইশরাক হোসেন। ২০২০ সালের নির্বাচন থেকে ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত তার রাজনৈতিক পথ মামলা, রায়, গেজেট, প্রশাসক নিয়োগ, সংসদ সদস্য পদ, প্রতিমন্ত্রিত্ব এবং সর্বশেষ অস্ত্র হাতে অভিযানের বিতর্কে ভরপুর। প্রতিটি পর্বেই নতুন নাটকীয়তা তৈরি হয়েছে।

শুরুটা হয়েছিল ২০২০ সালের সিটি নির্বাচন দিয়ে। ১ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী শেখ ফজলে নূর তাপসের কাছে বিএনপির প্রার্থী ইশরাক হোসেন পরাজিত হন। ঘোষিত ফলাফলে তাপস চার লাখের বেশি ভোট পান, ইশরাক পান দুই লাখ ছত্রিশ হাজার ভোট।

ফলাফল প্রকাশের পর থেকেই বিএনপি ও ইশরাক অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ তোলেন। এক মাস পর ৩ মার্চ নির্বাচন কমিশনের গেজেট চ্যালেঞ্জ করে মামলা করেন ইশরাক। মামলায় তাপস ও প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ আটজনকে বিবাদী করা হয়। এই মামলাই পরবর্তী পাঁচ বছরের আইনি ও রাজনৈতিক নাটকের ভিত্তি তৈরি করে।

দীর্ঘ শুনানির পর ২০২৫ সালের ২৭ মার্চ ঢাকার প্রথম যুগ্ম জেলা জজ ও নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের বিচারক ২০২০ সালের নির্বাচনের ফলাফল বাতিল করে রায় দেন। রায়ে শেখ ফজলে নূর তাপসের মেয়র নির্বাচিত হওয়ার বৈধতা বাতিল করা হয় এবং ইশরাক হোসেনকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।

এই রায়ের পর দ্বিতীয় দফা নাটক শুরু হয়। রায়ের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত চায়। কিন্তু মতামত আসার আগেই ২৭ এপ্রিল রাতে কমিশন সংশোধিত গেজেট প্রকাশ করে, যেখানে তাপসের পরিবর্তে ইশরাককে নির্বাচিত মেয়র হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ততদিনে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পুরোপুরি বদলে গেছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয়। ১৯ আগস্ট স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন জারি করে ঢাকার দুই সিটিসহ দেশের ১২টি সিটি করপোরেশনের মেয়রদের অপসারণ করে। ঢাকা দক্ষিণের মেয়র পদেও প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। ফলে ট্রাইব্যুনালের রায় ও গেজেট পেলেও ইশরাক মেয়রের চেয়ারে বসতে পারবেন কিনা তা নিয়ে আইনি বিতর্ক তৈরি হয়। সরকারের অবস্থান ছিল, সব সিটিতে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং মেয়াদ শেষের দিকে, তাই নতুন করে শপথ পড়ানো জটিল। বিরোধী মত ছিল, গেজেট যেহেতু হয়েছে, শপথ পড়াতেই হবে। শেষ পর্যন্ত ইশরাক মেয়রের দায়িত্ব নিতে পারেননি, কিন্তু রাজপথে তার অবস্থান আরও শক্ত হয়।

২০২৬ সালে তিনি ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং পরে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। এই সময়ে তিনি পুরান ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ড্রেনেজ, ডেঙ্গুর রেড জোন, বুড়িগঙ্গা দূষণ ও রাস্তা সংস্কার নিয়ে সক্রিয় হন। ৪ অক্টোবর মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, দল চাইলে তিনি মেয়র নির্বাচনে প্রস্তুত, দল অন্য কাউকে মনোনয়ন দিলেও তিনি সর্বোচ্চ সহযোগিতা করবেন। এই বক্তব্য নতুন আলোচনা তৈরি করে যে তিনি সংসদ সদস্য পদ ও মন্ত্রিত্ব ছেড়ে আবার মেয়র নির্বাচনে যাবেন কিনা।

সাম্প্রতিক বিতর্ক শুরু হয় ১৭ অক্টোবর। গেন্ডারিয়ায় কথিত মাদকবিরোধী অভিযানের সময় ইশরাককে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে দেখা যায় এমন একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওকে কেন্দ্র করে প্রশ্ন ওঠে, একজন প্রতিমন্ত্রী নিজে অস্ত্র হাতে এ ধরনের অভিযানে অংশ নিতে পারেন কিনা এবং এটি আইনগত সীমা লঙ্ঘন কিনা। ঢাকা মহানগর পুলিশ ঘটনাটি তদন্তের উদ্যোগ নেয়। সমালোচকরা বলেন, জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহযোগিতা করা, নিজে আইন প্রয়োগকারীর ভূমিকায় যাওয়া নয়। তার সমর্থকদের দাবি, পুরান ঢাকায় মাদকের বিস্তার রোধে তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগ নিয়েছেন।

এই বিতর্কের মধ্যেই ১৮ অক্টোবর রাতে তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ থেকে জানানো হয়, তিনি ১৯ অক্টোবর দুপুর ২টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেবেন। ১৯ অক্টোবর সকালে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়, রাতভর নাটকের পর তিনি মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেছেন।

ইশরাককে ঘিরে এই ধারাবাহিক নাটকের পেছনে তিনটি রাজনৈতিক বাস্তবতা কাজ করছে। প্রথমত, ঢাকা দক্ষিণ বিএনপির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি। সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার ছেলে হিসেবে ইশরাকের একটি আবেগী ভোট ব্যাংক রয়েছে।

দ্বিতীয়ত, প্রশাসক বনাম নির্বাচিত প্রতিনিধি দ্বন্দ্ব। বর্তমানে ঢাকা দক্ষিণে প্রশাসক হিসেবে আব্দুস সালাম এবং উত্তরে শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন দায়িত্বে আছেন। হকার উচ্ছেদ, অবৈধ স্থাপনা অপসারণ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযানে তারা সক্রিয়। তাদের হাতে প্রশাসনিক ক্ষমতা আছে, কিন্তু ইশরাকের হাতে নেই। ফলে নিজের জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে তিনি নিজ উদ্যোগে মাঠে নামছেন, যা প্রশাসনের সাথে দ্বন্দ্ব তৈরি করছে।

তৃতীয়ত, দলীয় কৌশল। বিএনপি সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে ভাবছে। ইশরাককে মেয়র প্রার্থী করা হবে নাকি সংসদেই রাখা হবে, এটি দলের জন্য একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত।

সব মিলিয়ে ইশরাকের গল্পটি একটি ব্যক্তির গল্প নয়, এটি ঢাকার নগর রাজনীতি, আদালতের রায় বনাম প্রশাসনিক বাস্তবতা এবং নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তে একজন তরুণ নেতার অবস্থান খোঁজার গল্প। মেয়র পদে শপথ না পাওয়া থেকে প্রতিমন্ত্রিত্ব, আবার প্রতিমন্ত্রিত্ব ছেড়ে মেয়র হওয়ার আকাঙ্ক্ষা, এই চক্রই তাকে বারবার আলোচনার কেন্দ্রে আনছে। পদত্যাগের ঘোষণার পর এই নাটক শেষ হয় নাকি নতুন অঙ্কে প্রবেশ করে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

বর্তমানদিন/ফআ



  
  সর্বশেষ
ইশরাক হোসেনকে নিয়ে যত নাটক
মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করলেন ইশরাক হোসেন
‘শর্ত মানলে ৭ দিনেই খুলবে হরমুজ প্রণালি’
দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড, সৌদি আরবের কাছে ব্যাখ্যা চাইলো বাংলাদেশ

প্রধান সম্পাদক: মতিউর রহমান , সম্পাদক: জাকির হোসেন, নির্বাহী সম্পাদক এসএম আবুল হাসান। সম্পাদক কর্তৃক ২ আরকে মিশন রোড, ঢাকা ১২০৩ থেকে প্রকাশিত এবং বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস ২০১৯ ফকিরাপুল , ঢাকা ১০০০ থেকে মুদ্রিত। বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: জামান টাওয়ার (৪র্থ তলা) ৩৭/২ পুরাণা পল্টন, ঢাকা ১০০০
ফোন: ০১৫৫৮০১১২৭৫, ০১৭১১১৪৫৮৯৮, ০১৭২৭২০৮১৩৮। ই-মেইল: bortomandin@gmail.com, ওয়েবসাইট: bortomandin.com