বুধবার, অক্টোবর ৭, ২০২৬
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
|
শিরোনাম :

   সম্পাদকীয়
শিক্ষকই সমাজ গঠনের মূল হাতিয়ার
  Date : 05-10-2026
Share Button

সালাহউদ্দিন মিঠু

একটি সমাজ কেমন হবে, তা নির্ভর করে না তার বড় বড় দালানের ওপর, নির্ভর করে না তার বাজেটের আকারের ওপর। একটি সমাজ কেমন হবে, তা নির্ভর করে তার শ্রেণিকক্ষ কেমন তার ওপর। আর শ্রেণিকক্ষের প্রাণ হলেন শিক্ষক। তাই বলা যায়, শিক্ষকই সমাজ গঠনের মূল হাতিয়ার। এই কথাটি কোনো আবেগী বাক্য নয়, এটি একটি বৈজ্ঞানিক সত্য।

আমরা প্রায়ই বলি, আজকের ছাত্র আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। কিন্তু এই ভবিষ্যৎ তৈরি করেন কে? একজন ডাক্তার একজন রোগীকে সুস্থ করেন, একজন ইঞ্জিনিয়ার একটি ব্রিজ তৈরি করেন, একজন কৃষক ফসল ফলান। কিন্তু একজন ডাক্তারকে ডাক্তার বানান, একজন ইঞ্জিনিয়ারকে ইঞ্জিনিয়ার বানান, একজন কৃষককে আধুনিক চাষাবাদ শেখান একজন শিক্ষক। অর্থাৎ সব পেশার জন্মদাতা হলো শিক্ষকতা পেশা। তাই সমাজের ভিত্তি যদি মজবুত করতে হয়, তাহলে শিক্ষককে মজবুত করতে হবে।

শিক্ষক শুধু বই পড়ান না, তিনি মানুষ গড়েন-
আমাদের দেশে একটি ভুল ধারণা আছে, শিক্ষকের কাজ শুধু সিলেবাস শেষ করা। আসলে সিলেবাস তো গুগলও পড়াতে পারে। ইউটিউবেও সব পড়া আছে। তাহলে শিক্ষকের প্রয়োজন কী?
প্রয়োজন এখানেই যে, শিক্ষক তথ্য দেন না, তিনি বোধ তৈরি করেন। একটি শিশু যখন প্রথম স্কুলে আসে, সে মিথ্যা বলা, সত্য বলা, ভাগ করে খাওয়া, অন্যকে সম্মান করা কিছুই জানে না। পরিবারের পর এই মূল্যবোধগুলো তাকে প্রথম শেখান শিক্ষক। 

একজন শিক্ষক যখন ক্লাসে সততার গল্প বলেন, তখন একটি ছাত্র শুধু গল্প শোনে না, সে সৎ হতে শেখে। যখন তিনি দুর্বল ছাত্রটিকে আলাদা করে সময় দেন, তখন ক্লাসের সবাই সহমর্মিতা শিখে ফেলে। এই যে অদৃশ্য শিক্ষা, এই শিক্ষাই সমাজ গঠন করে। একটি দুর্নীতিমুক্ত সমাজ, একটি সহিংসতামুক্ত সমাজ, একটি মানবিক সমাজ কখনোই আইন দিয়ে তৈরি করা যায় না, তা তৈরি হয় শ্রেণিকক্ষ থেকে।

জাপানের উদাহরণ আমরা সবাই জানি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পারমাণবিক বোমায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া একটি দেশ আজ বিশ্বের সবচেয়ে সভ্য দেশ। তারা কী করেছিল? তারা তাদের শিক্ষকদের সবচেয়ে বেশি সম্মান ও বেতন দিয়েছিল। জাপানে শিক্ষকদের জন্য আলাদা ট্রেন আছে, আলাদা দোকান আছে। কারণ তারা জানে, শিক্ষক ঠিক থাকলে দেশ ঠিক থাকবে।

তাহলে আমাদের সমাজে সমস্যা কোথায় ?
আজ বাংলাদেশে শিক্ষকদের অবস্থা যদি আমরা দেখি, তাহলে বুঝবো কেন আমাদের সমাজে এত অস্থিরতা। প্রথমত, আমরা শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে আকর্ষণীয় করতে পারিনি। মেধাবী ছাত্ররা এখন শিক্ষক হতে চায় না, হতে চায় বিদেশে চাকরিজীবী বা কর্পোরেট অফিসার। কারণ একজন শিক্ষক যে বেতন পান, তা দিয়ে ঢাকা শহরে সম্মান নিয়ে চলা কঠিন। একজন প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষককে যদি সংসার চালাতে প্রাইভেট পড়াতে হয়, তাহলে তিনি ক্লাসে মন দেবেন কীভাবে?
দ্বিতীয়ত, আমরা শিক্ষককে সম্মান দিতে ভুলে গেছি। একসময় গ্রামে শিক্ষক দেখলে সবাই সালাম দিত, চেয়ার ছেড়ে দিত। এখন ছাত্র শিক্ষককে অপমান করে, অভিভাবক এসে শিক্ষককে হুমকি দেয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শিক্ষকদের নিয়ে ট্রল করা হয়। যে সমাজ শিক্ষককে অপমান করে, সেই সমাজ কখনো বড় হতে পারে না।
তৃতীয়ত, আমাদের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে। পৃথিবী বদলে গেছে। এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইন্টারনেটের যুগ। কিন্তু আমাদের অনেক শিক্ষক এখনো ২০ বছর আগের নোট দিয়ে পড়ান। তাদেরকে নতুন প্রযুক্তি, নতুন মনোবিজ্ঞান, নতুন শিক্ষা পদ্ধতি শেখানোর কোনো ব্যবস্থা নেই।
সমাজ গঠনে শিক্ষককে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে হলে তিনটি কাজ জরুরি।
১. শিক্ষকের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। যাতে তাকে ক্লাসের বাইরে টাকার চিন্তা করতে না হয়। ফিনল্যান্ডে শিক্ষকদের বেতন দেশের সর্বোচ্চ বেতনগুলোর একটি। তাই সেখানে সবচেয়ে মেধাবীরা শিক্ষক হন। আমাদেরও সেই পথে যেতে হবে। শিক্ষকদের জন্য আলাদা বেতন কাঠামো, আবাসন ও স্বাস্থ্য সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
২. শিক্ষককে স্বাধীনতা দিতে হবে। তিনি কী পড়াবেন, কীভাবে পড়াবেন, সেই স্বাধীনতা তার থাকতে হবে। শুধু পরীক্ষার রেজাল্ট দিয়ে একজন শিক্ষককে বিচার করা বন্ধ করতে হবে। একজন ভালো শিক্ষক ১০০ জন এ প্লাস তৈরি করেন না, তিনি ১০০ জন ভালো মানুষ তৈরি করেন।
৩. সমাজকে শিক্ষকের পাশে দাঁড়াতে হবে। রাষ্ট্রের পাশাপাশি অভিভাবক, ছাত্র ও মিডিয়াকে শিক্ষকের সম্মান ফিরিয়ে আনতে হবে। শিক্ষক দিবসে শুধু ফুল নয়, সারা বছর শিক্ষককে সম্মান করার সংস্কৃতি চালু করতে হবে।
শেষ কথা হলো, একটি জাতিকে ধ্বংস করতে হলে তার শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করলেই হয়। আর একটি জাতিকে গড়তে হলে তার শিক্ষককে গড়তে হয়।
আজকের যে শিশুটি ক্লাসে বসে আছে, সে ২০ বছর পর এই দেশ চালাবে। সে ঘুষ খাবে নাকি ঘুষের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে, সে মানুষকে ভালোবাসবে নাকি মানুষের ক্ষতি করবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে তার শিক্ষক আজ তাকে কী শেখাচ্ছেন তার ওপর।

তাই আসুন, শিক্ষককে শুধু চাকরিজীবী হিসেবে না দেখে, সমাজের কারিগর হিসেবে দেখি। শিক্ষকের হাতে বই তুলে দিই, তার কাঁধ থেকে ঋণের বোঝা নামিয়ে দিই। তাহলেই শিক্ষক তার আসল হাতিয়ার হয়ে উঠবেন এবং একটি সুন্দর, মানবিক ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ে উঠবে।



  
  সর্বশেষ
সাংবাদিকের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলা প্রত্যাহারে ক্র্যাবের আল্টিমেটাম
প্রমত্তা পদ্মাপাড়ে গণমাধ্যমকর্মীদের মিলনমেলা অনুষ্ঠিত
৬ লাখ কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ
রিকশাচালকের ছেলে শতকোটি টাকার মালিক: কার ছত্রছায়ায় সোহেলের এই উত্থান?

প্রধান সম্পাদক: মতিউর রহমান , সম্পাদক: জাকির হোসেন, নির্বাহী সম্পাদক এসএম আবুল হাসান। সম্পাদক কর্তৃক ২ আরকে মিশন রোড, ঢাকা ১২০৩ থেকে প্রকাশিত এবং বিসমিল্লাহ প্রিন্টিং প্রেস ২০১৯ ফকিরাপুল , ঢাকা ১০০০ থেকে মুদ্রিত। বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়: জামান টাওয়ার (৪র্থ তলা) ৩৭/২ পুরাণা পল্টন, ঢাকা ১০০০
ফোন: ০১৫৫৮০১১২৭৫, ০১৭১১১৪৫৮৯৮, ০১৭২৭২০৮১৩৮। ই-মেইল: bortomandin@gmail.com, ওয়েবসাইট: bortomandin.com