নিজস্ব প্রতিবেদক
আজ ৪ অক্টোবর, বিশ্ব প্রাণী দিবস। প্রাণীদের অধিকার রক্ষা, তাদের প্রতি নিষ্ঠুরতা রোধ এবং মানুষ ও প্রাণীর সহাবস্থান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালিত হয়।
১৯২৫ সালে জার্মানির বার্লিনে প্রথম এই দিবস পালনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। লেখক ও প্রাণী অধিকারকর্মী হাইনরিখ জিমারম্যানের উদ্যোগে শুরু হয় দিবসটি। পরে ১৯২৯ সাল থেকে ৪ অক্টোবর তারিখে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। এই দিনটি খ্রিস্টান সাধু সেন্ট ফ্রান্সিসের মৃত্যু দিবস, যিনি প্রাণীদের রক্ষক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ১৯৩১ সালে ইতালির ফ্লোরেন্সে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক প্রাণী সুরক্ষা কংগ্রেসে ৪ অক্টোবরকে বিশ্ব প্রাণী দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
দিবসটি উপলক্ষে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নানা কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তর, বন বিভাগ, বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন ও প্রাণী কল্যাণ সংস্থা আলোচনা সভা, র্যালি, সচেতনতামূলক প্রচারণা ও টিকাদান কর্মসূচির আয়োজন করেছে।
বাংলাদেশে প্রাণী দিবসের গুরুত্ব অনেক বেশি। দেশে প্রায় ৩০ লাখ গৃহপালিত ও বেওয়ারিশ কুকুর, ২০ লাখ বিড়াল, ২ কোটির বেশি গরু-ছাগল রয়েছে। এছাড়া সুন্দরবনসহ বিভিন্ন বনে রয়েছে বাঘ, হাতি, হরিণ, বানরসহ নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণী। কিন্তু বাস্তব চিত্র উদ্বেগজনক। প্রথম সমস্যা হলো বেওয়ারিশ প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা। রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরে প্রায়ই কুকুর-বিড়ালকে পিটিয়ে হত্যা, গরম পানি ঢেলে দেওয়া ও বিষ খাইয়ে মারার ঘটনা ঘটছে। অনেক ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনের উদ্যোগেও অপরিকল্পিতভাবে কুকুর নিধন করা হচ্ছে। দ্বিতীয় সমস্যা হলো বন্যপ্রাণী হত্যা ও পাচার। সুন্দরবনে বাঘ, হরিণ শিকার, হাতির আবাসস্থল ধ্বংস, পাখি শিকার ও বিদেশে পাচারের ঘটনা বাড়ছে। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে ১২০টি বন্যপ্রাণী পাচারের ঘটনা ধরা পড়েছে। তৃতীয় সমস্যা হলো আবাসস্থল সংকট। নগরায়ন, বন উজাড় ও জলাশয় ভরাটের কারণে প্রাণীদের আবাসস্থল কমে যাচ্ছে। ঢাকার আশপাশে শিয়াল, বেজি, গুইসাপের মতো প্রাণী এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। চতুর্থ সমস্যা হলো সচেতনতার অভাব। অনেক মানুষ জানে না যে, প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। প্রাণী কল্যাণ আইন ২০১৯ অনুযায়ী, কোনো প্রাণীকে অকারণে হত্যা বা নির্যাতন করলে ৬ মাস থেকে ২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাণী রক্ষা মানে পরিবেশ রক্ষা। একটি প্রাণী বিলুপ্ত হলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়। যেমন, কুকুর-বিড়াল কমে গেলে ইঁদুর ও পোকামাকড় বাড়বে। পাখি কমে গেলে ফসলের ক্ষতি হবে। বাঘ না থাকলে সুন্দরবনের পরিবেশ ধ্বংস হবে। এই অবস্থায় প্রাণী দিবসে ৪টি বিষয়ে জোর দেওয়া প্রয়োজন। বেওয়ারিশ কুকুর-বিড়ালের জন্য বিজ্ঞানসম্মত বন্ধ্যাত্বকরণ ও টিকাদান কর্মসূচি বাড়ানো, বন্যপ্রাণী পাচার রোধে কঠোর নজরদারি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রাণীর প্রতি ভালোবাসা বিষয়ে পাঠদান এবং প্রাণী কল্যাণ আইনের কঠোর প্রয়োগ।
বিশ্ব প্রাণী দিবস শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়। এই দিনটি মানুষকে মনে করিয়ে দেয়, এই পৃথিবী শুধু মানুষের নয়, প্রাণীদেরও। মানুষ ও প্রাণী একসাথে বাঁচলেই পৃথিবী সুন্দর থাকবে।