বিশেষ প্রতিবেদন
বাংলাদেশের তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের যোগ্য করে তুলতে ২০২১ সালে শুরু হয় “এসেট প্রকল্প”, যার মেয়াদ ২০২৬ সাল পর্যন্ত। বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরে পরিচালিত এই প্রকল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন অনুদান - যার জন্য বরাদ্দ প্রায় ১১৭০ কোটি টাকা।
সম্প্রতি এই প্রকল্পে সংঘটিত ব্যাপক দুর্নীতি, অনিয়ম ও আর্থিক অসঙ্গতি সংক্রান্ত গুরুতর অপরাধের বিস্তৃত চিত্র তুলে ধরে মঙ্গলবার (২৩ জুন) বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসে একটি লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্পটির বিভিন্ন কার্যক্রমে স্বচ্ছতার অভাব, অনিয়ম এবং আর্থিক দুর্নীতির ঘটনা ঘটে আসছে, যার ফলে প্রকল্পের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে এবং এর লক্ষ্য অর্জন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। এজন্য প্রকল্প পরিচালক মীর জাহিদ হাসান, উপ-প্রকল্প পরিচালক মোঃ মঞ্জুরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ মাহাত, হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা সেলিম ভূইয়া ও মোহাম্মদ নূর আলমসহ ফাইনান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট স্পেশালিস্টদের বিরুদ্ধে একটি সিন্ডিকেট গঠন করে দুর্নীতির মাধ্যমে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা না দিলে বিল আটকে রাখা, পারসেন্টেজে সমঝোতা না হলে পুনরায় টেন্ডার আহ্বান করা এবং টেন্ডার মূল্যায়নের পর দীর্ঘদিন ফাইল স্থগিত রাখার মতো অনিয়ম নিয়মিতভাবে ঘটছে। এছাড়া বড় অংকের অর্থ দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জন করে ঢাকায় ফ্ল্যাট ক্রয় ও আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার অভিযোগও উত্থাপন করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে উপ-প্রকল্প পরিচালক রবীন্দ্রনাথ মাহাতের বিরুদ্ধে এন্টারপ্রাইজ বেইজড ট্রেনিং (EBT), সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ ও কমিউনিকেশন কার্যক্রমে অনিয়মের বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে। অভিযোগ করা হয়েছে, পর্যাপ্ত সক্ষমতা না থাকা সত্ত্বেও অর্থের বিনিময়ে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রকে কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে চুক্তি করে আর্থিক সুবিধা গ্রহণ এবং হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগও উত্থাপিত হয়েছে।
এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, ইবিটি কার্যক্রমে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়োগ প্রদান এবং প্রতি অকুপেশনে ৮৬,০০০ টাকা করে গ্রহণের মতো আর্থিক অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, শর্ট কোর্সের পিএমইউ সাপোর্ট সার্ভিসের অর্থ কর্মচারীদের প্রদান না করে কয়েক কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। উপ-প্রকল্প পরিচালক মোঃ মঞ্জুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে প্রশাসন, অর্থ ও প্রকিউরমেন্ট কার্যক্রমে অনিয়ম এবং আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে কাজ প্রদান করার অভিযোগ আনা হয়েছে। একইসঙ্গে পারসেন্টেজে সমঝোতা না হলে টেন্ডার পুনরায় আহ্বান বা মূল্যায়ন শেষে দীর্ঘদিন ঝুলিয়ে রাখার ঘটনাও উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগে আরএফও পদ্ধতির মাধ্যমে কোনো প্রকৃত ক্রয় ছাড়াই অর্থ উত্তোলনের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে।
এছাড়া ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের বিভিন্ন অডিট আপত্তি যথাযথ কর্তৃপক্ষকে অবহিত না করে অনিয়মতান্ত্রিকভাবে নিষ্পত্তি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, প্রকল্পের বাইরে একটি ব্যক্তিগত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, যা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার পরিপন্থী।
ইবিটি, প্রকিউরমেন্ট, আরপিএল এবং শর্ট কোর্স কার্যক্রমে ব্যাপক অনিয়মের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অবৈধভাবে আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করেছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীরা বিষয়গুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তারা মনে করেন, এই ধরনের তদন্ত প্রকল্পে সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। উক্ত অভিযোগপত্রের অনুলিপি অর্থ মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সংশ্লিষ দপরে প্রেরণ করা হয়েছে।
উল্লেখ্য যে, একাধিক সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী অর্থ ব্যবহার কম হওয়ায় প্রকল্পের অগ্রগতি ব্যাহত হচ্ছে এবং সরকারকে অব্যবহৃত ঋণের বিপরীতে সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে। এই প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল ২২০টি প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন অনুদানের আওতায় আনা। বাস্তবে এখন পর্যন্ত ১৭২টি প্রতিষ্ঠান অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ব্যয়ের হারও তুলনামূলকভাবে কম- এই পর্যন্ত ব্যবহৃত অর্থ মাত্র ৪৮.৪১ কোটি টাকা।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৩-২৪ ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট ৪০০ কোটি টাকা ঋণ ছাড় করা হলেও ব্যয়ের হার ০–৫ শতাংশের মধ্যে। ফলে অব্যবহৃত অর্থের বিপরীতে সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে সরকারকে, যা জনগণের করের অর্থ থেকে মেটানো হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দায়িত্বহীনতা, দুর্বল তদারকি ও ব্যবস্থাপনার অভাব প্রকল্পের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করছে। তাদের পরামর্শ-এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে, যেমন কর্মকর্তাদের পুনর্বিন্যাস, স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ ও প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি—প্রকল্পটি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হতে পারে।