নেহাল আহমেদ, রাজবাড়ী
এক যুগেরও বেশি সময় ধরে নীরবে মানুষের জীবনে আলো ছড়িয়ে চলেছেন রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার বীর মুক্তিযোদ্ধা খায়রুল বাসার খান। অর্থাভাবে যারা চোখের ছানি বা নেত্রনালীর অপারেশন করাতে পারেন না, তাদের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি ইতোমধ্যে চার শতাধিক মানুষের দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিতে সহায়তা করেছেন।
২০১৫ সালে শুরু হওয়া তার এই মানবিক উদ্যোগ এখন রাজবাড়ী, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জসহ আশপাশের কয়েকটি জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। মধুখালীর মালেকা চক্ষু হাসপাতালের সহযোগিতায় তিনি দরিদ্র মানুষের ছানি ও নেত্রনালীর অপারেশনের ব্যবস্থা করে চলেছেন।
অন্ধকার থেকে আলোয় ফেরার এই গল্পের নেপথ্যের মানুষটির বাড়ি রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলার খোর্দ্দমেগচামী গ্রামে। আনসার ও ভিডিপি থেকে অবসর নেওয়ার পর কৃষিকাজে যুক্ত হলেও মানুষের সেবাই হয়ে উঠেছে তার জীবনের প্রধান ব্রত। ভিডিপিতে দায়িত্ব পালনকালে তিনি রাষ্ট্রপতি পদকও অর্জন করেন।
খায়রুল বাসার খান জানান, সঠিক হিসাব না থাকলেও চার শতাধিক মানুষের অপারেশনের ব্যবস্থা করেছেন তিনি। প্রায়ই দরিদ্র মানুষ বিভিন্ন চোখের সমস্যা নিয়ে তার কাছে আসেন, আর তিনি চেষ্টা করেন তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে।
যেভাবে শুরু
নিজের স্ত্রীর চোখের নেত্রনালীর সমস্যার কারণে ২০১৫ সালের শুরুর দিকে তিনি মালেকা চক্ষু হাসপাতালে যান। সেখানে দুইজন দরিদ্র মানুষকে অপারেশনের খরচ জোগাড় করতে না পেরে কান্না করতে দেখেন। সেই দৃশ্য তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।
তিনি বলেন, “তখন মনে হয়েছিল, আমি কি তাদের পাশে দাঁড়াতে পারি না? শুধু ওই দুজন নয়, এমন শত শত মানুষ আছে, যারা টাকার অভাবে এই সুন্দর পৃথিবী দেখতে পারছে না। সেই ভাবনা থেকেই শুরু করি ছানি ও নেত্রনালীর অপারেশনে সহযোগিতা।”
তার এই উদ্যোগে পরিবারের সদস্যরাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। তিনি জানান, তার মেয়ের জামাই শামিম আহমেদ এবং ছেলে নিয়মিত আর্থিক সহায়তা করেন। তাদের সহযোগিতা ছাড়া এতদূর এগিয়ে আসা সম্ভব হতো না।
ফিরে পাওয়া জীবনের আলো
বালিয়াকান্দির আলেয়া বেগম জানান, চোখের সমস্যার কারণে তার স্বাভাবিক জীবন প্রায় থমকে গিয়েছিল। রান্না করতে গিয়ে ভুল হতো, চলাফেরাও ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। অপারেশনের খরচ জোগাড় করার সামর্থ্য ছিল না। পরে পরিচিতজনের মাধ্যমে খায়রুল বাসার খানের কাছে গিয়ে চিকিৎসার সুযোগ পান।
একই অভিজ্ঞতার কথা বলেন কালুখালীর দিনমজুর আব্দুল খালেক (৫৮)। তিনি বলেন, “চোখে ঠিকমতো দেখতে পেতাম না, কাজও করতে পারতাম না। এখন আবার মাঠে কাজ করতে পারছি।”
মানবতার আলোকবর্তিকা
খায়রুল বাসার খান জানান, সাধারণভাবে একজন রোগীর ছানি অপারেশনে প্রায় ৮ হাজার টাকা খরচ হলেও মানবিক বিবেচনায় মালেকা চক্ষু হাসপাতাল তার কাছ থেকে মাত্র ৪ হাজার ৫০০ টাকা গ্রহণ করে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সহযোগিতার কারণেই আরও বেশি মানুষের পাশে দাঁড়ানো সম্ভব হচ্ছে।
মুক্তিযোদ্ধা ভাতা, কৃষিকাজ থেকে পাওয়া আয় এবং পরিবারের সহায়তাই তার এই উদ্যোগের প্রধান ভরসা। তিনি বলেন, “টাকা দিলে একসময় শেষ হয়ে যায়। কিন্তু কারও চোখের আলো ফিরিয়ে দিতে পারলে সেটাই জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ।”
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি আকরাম হোসেন বলেন, “খায়রুল বাসার খান এলাকায় সম্মান ও নির্ভরতার এক অনন্য নাম। কোনো ছানি রোগীর খবর পেলেই তিনি নিজে তার বাড়িতে যান। রোগীকে হাসপাতালে নেওয়া, অপারেশনের ব্যবস্থা করা এবং সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে পাশে থাকেন।”
গ্রামের মানুষের কাছে চোখের ছানি একটি বড় সমস্যা। অর্থাভাবে অনেকেই চিকিৎসা করাতে পারেন না এবং ধীরে ধীরে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেন। এমন বাস্তবতায় খায়রুল বাসার খানের উদ্যোগ শুধু চিকিৎসাসেবা নয়, মানুষের জীবনে নতুন আশার আলোও জ্বালিয়ে দিচ্ছে।
তার বাড়ি থেকে বিদায় নেওয়ার সময় মনে হচ্ছিল, সামনে শুধু আলোয় ভরা পৃথিবী। যেন এক মানুষের নীরব মানবিকতার আলো ছড়িয়ে পড়েছে দশ দিগন্তে। খায়রুল বাসার খান যেন সত্যিই একজন ল্যাম্পলাইটার—যিনি মানুষের চোখে শুধু দৃষ্টি নয়, জীবনের আলো ফিরিয়ে দেন।