সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি বাংলা টিভি চ্যানেলে দেওয়া সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের নেপথ্যে থাকা বেশ কিছু অভ্যন্তরীণ সংকট ও প্রশাসনিক দুর্বলতার চিত্র তুলে ধরেছেন। বর্তমানে নিউ ইয়র্কে অবস্থানরত এই প্রবীণ রাজনীতিক তাঁর সরকারের শেষ সময়ের অভিজ্ঞতাকে ‘তিক্ত’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
আব্দুল মোমেনের সাক্ষাৎকারের মূল বিষয়গুলো নিচে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
১. প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তৈরি হওয়া ‘দূরত্ব’
আব্দুল মোমেন জানান, বিশেষ করে কোভিড মহামারির পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে মন্ত্রীদেরও সাক্ষাতের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত হয়ে গিয়েছিল।
-
আমলাতন্ত্রের প্রভাব: প্রধানমন্ত্রীর অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ন্ত্রণ করতেন সরকারি কর্মকর্তারা, যারা নানা বাহানায় রাজনীতিবিদদের দেখা করতে দিতেন না।
-
এসএসএফ-এর কড়াকড়ি: জনসভায় বক্তৃতা শেষে রাজনীতিবিদরা কথা বলতে চাইলে এসএসএফ (SSF) তাদের দূরে সরিয়ে দিত। ফলে মাঠপর্যায়ের প্রকৃত অবস্থা বা দুর্নীতির তথ্য প্রধানমন্ত্রীকে জানানো অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।
২. চাঁদাবাজি ও জনবিচ্ছিন্নতা
সাবেক এই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মতে, আওয়ামী লীগ সরকারের বড় অপরাধ ছিল জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ততা কমে যাওয়া।
-
পদ-পদবি বাণিজ্য: এক শ্রেণির নেতা চাঁদাবাজিতে মত্ত হয়ে পড়েছিলেন এবং টাকার বিনিময়ে পদায়ন করা হচ্ছিল।
-
অসহায়ত্ব: আব্দুল মোমেন বলেন, "আমরা খালি প্রশংসা করেই শেষ করি, দোষটা বলতে চাই না।" এমনকি প্রধানমন্ত্রীর পিয়নের ৪০০ কোটি টাকা বানানোর ঘটনাও তিনি উল্লেখ করেন।
৩. প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি ও প্রকল্প বিলম্ব
আব্দুল মোমেন সিলেটে বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের উদাহরণ টেনে বলেন:
-
ইচ্ছাকৃত বিলম্ব: প্রকল্প অনর্থক দেরি করানো হয় যেন খরচ বাড়ানো যায় এবং সেই অতিরিক্ত বরাদ্দের ৮০ শতাংশই দুর্নীতিবাজরা লুটে নেয়।
-
ব্যাংকিং খাতের নৈরাজ্য: নির্দিষ্ট কিছু ব্যবসায়িক গোষ্ঠীকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া ও ব্যাংকগুলোতে একচ্ছত্র আধিপত্যের সমালোচনা করেন তিনি।
৪. আমলা বনাম রাজনীতিবিদ
তিনি অভিযোগ করেন যে, সরকার অতিরিক্ত মাত্রায় সরকারি কর্মচারীদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল। মোমেনের মতে, রাজনীতিবিদরা একা দুর্নীতি করতে পারেন না; তাঁরা মূলত কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় এবং আঁতাতের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ করেন।
৫. কোটা সংস্কার আন্দোলনে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অভাব
কোটা সংস্কার আন্দোলন প্রসঙ্গে তিনি জানান, আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মীই কোটা যৌক্তিকীকরণের পক্ষে ছিলেন।
-
ভুল কৌশল: বিষয়টি যখন আদালতে যায়, তখন তিনি ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে বলেছিলেন যে এটি একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত ছিল। তিনি আব্রাহাম লিংকনের উদাহরণ টেনে বলেন, আদালত অনেক সময় ভুল প্রথা রক্ষা করে, কিন্তু রাজনৈতিক সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত পরিবর্তন আনে।