আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত হলে যারা পরাজিত হবে, তাদের নিয়ে ঐক্যের সরকার গঠন করবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট।
শনিবার (৩১ জানুয়ারি) দুপুরে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে ১১ দলীয় জোটের নির্বাচনি সমাবেশে এ কথা জানিয়ে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, আগামীতে নির্বাচিত হলে ১১ দলীয় জোট দেশে একটা ঐক্যের সরকার গঠন করবে। আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বীরা হেরে গেলেও তাদেরকে নিয়ে ঐক্যের সরকার গঠন করা হবে। আগামীর বাংলাদেশ হবে তারুণ্যের বাংলাদেশ। যুবকদের বাংলাদেশ। পেছনের সব ঐতিহ্যকে ধারণ করে আমরা সামনে এগিয়ে যাব। আমাদের লক্ষ্য বাংলাদেশে ঐক্য সৃষ্টি করা। আমরা জাতিকে ঐক্যের বার্তা দিচ্ছি।
জামায়াত আমির বলেন, আমাদের প্রতিপক্ষ যদি ভোটে পরাজিত হয় তারপরও আমরা তাদেরকে নিয়ে ঐক্যের সরকার গঠন করব। তবে তাদেরকে কথা দিতে হবে ব্যাংক ডাকাতি, অনিয়ম-দুর্নীতি, চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে। মানুষের পকেটে হাত দেওয়া বন্ধ করতে হবে।
তিনি বলেন, দেশের যুবসমাজকে আমরা দেশ গড়ার হাতিয়ারে পরিণত করব। তারা বেকার ভাতা চায় না। তারা দক্ষ যুবসমাজে পরিণত হতে চায়। আমরা এই বাংলাদেশকে যুবকদের হাতে তুলে দিতে চাই। আমরা যাদেরকে প্রার্থী করেছি তাদের ৬২ ভাগ যুবক। এটা তারুণ্যের বাংলাদেশ। এ দেশের প্রত্যেকটা নাগরিকের ন্যায়বিচার করার ও পাওয়ার অধিকার আছে। আমরা এদেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করব। দেশের একজন সাধারণ নাগরিকের যে বিচার প্রেসিডেন্ট এবং প্রধানমন্ত্রীর ক্ষেত্রে সেই বিচার নিশ্চিত করা হবে।
এ সময় জামায়াত আমির বলেন, জুলাইকে সম্মান করতে হবে। জুলাই সংস্কারের সব শর্ত বাস্তবায়নে অঙ্গীকার করতে হবে। আমরা এই জাতিকে কোনোভাবেই আর বিভক্ত করতে চাই না।
তিনি বলেন, সব ধর্মের মানুষকে নিশ্চয়তা দিচ্ছি আপনারা ধর্মীয় স্বাধীনতা ভোগ করবেন। আপনারা পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করবেন। কেউ আপনাদের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে পারবে না।
শফিকুর রহমান বলেন, আমরা শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করতে চাই। এই শিক্ষা দিয়ে কোনো লাভ হবে না। শিক্ষা যদি ভালো না হয় ভালো জাতি আমরা গড়ে তুলতে পারব না। শিক্ষার ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন লাগবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ একটা পরিবর্তন চায়। ১৩ তারিখ যে পরিবর্তনটা আসবে সেটা আসবে যুবসমাজের আকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতে। আমরা আর কোনো ফ্যাসিবাদ দেখতে চাই না। আমরা আর কোনো আধিপত্য দেখতে চাই না। আমরা একটি মানবিক বাংলাদেশ দেখতে চাই। আগামী দিনে ১১ দল আপনাদের পক্ষ হয়ে এ জাতিকে পরিচালিত করবে। মন্ত্রিপরিষদের সিনিয়র একজন সদস্য পাবেন চৌদ্দগ্রামের জনগণ।
জামায়াত আমির বলেন, গত সাড়ে ১৫ বছর দেশবাসী মজলুম ছিলেন। যারা দীর্ঘদিন মজলুম ছিলেন তাদের পক্ষেই বাংলাদেশ থাকবে। আমরা জামায়াতে ইসলামীর বিজয় চাচ্ছি না। আমরা ১৮ কোটি মানুষের বিজয় চাচ্ছি। ১৮ কোটি মানুষের বিজয়ই হবে ১১ দলের বিজয়। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে ১১ দল লড়ে যাবে। বিজয়ের লক্ষ্যে আমরা চূড়ান্ত ভোটের লড়াই করছি। আমাদের বিজয় নিশ্চিত হবে, ইনশাআল্লাহ।
তিনি বলেন, ৫ আগস্টের পর আপনারা দেখেছেন কার কী ভূমিকা। আপনারা আমাদের ভূমিকা দেখলে সিদ্ধান্ত নিতে কঠিন হবে না বলে বিশ্বাস করি।
জামায়াত আমির বলেন, যারা মা-বোনদের গায়ে হাত দেয়, তাদের ইজ্জতে হাত দেয়, তাদের হাতে এ দেশের ৯ কোটি মা-বোন নিরাপদ নয়। এখন তাদের মাথা গরম হয়ে গেছে। সাধারণ নারীরা বলছে নিরাপত্তার জন্য আমাদের ১১ দল প্রয়োজন। তখন এগুলো শুনে তাদের মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে। বন্ধুরা মাথা গরম করবেন না। এখন তো মাঘ মাস। এত তাড়াতাড়ি মাথা গরম করলে কিভাবে হবে?
দেশের মানুষ মনে করছে জামায়াতে ইসলামী জোট ক্ষমতায় আসলেই দেশটা ঠিক হবে- যোগ করেন তিনি।
কোনো দলের নাম উল্লেখ না করে এ সময় জামায়াত আমির বলেন, আপনারা নারী সমাজকে সম্মান করতে শিখুন। মা-বোনদেরকে সম্মান করতে শিখুন। তাদের গায়ে হাত দেবেন না। আমাদেরকে কঠোর হতে বাধ্য করবেন না।
তিনি আরও বলেন, জুলাইকে অনেকে স্বীকার করে না। জুলাই যোদ্ধাদেরকে অনেকেই তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে। অথচ তাদের কারণেই আজকে আপনারা কথা বলতে পারছেন। আমরা কথা বলতে পারছি।
শফিকুর রহমান বলেন, চাঁদাবাজিসহ সব দুর্নীতি সমাজ থেকে দূর করে দিতে চাই। এমন একটা সমাজ বিনির্মাণ করতে চাই, যেখানে প্রত্যেকটা নাগরিক ইজ্জত-সম্মান এবং তার সম্পদ নিয়ে নিরাপদে বসবাস করতে পারবে।
কোনো দলের নাম উল্লেখ না করে তিনি বলেন, আপনারা চাঁদাবাজি-লুটপাট ছেড়ে দেন। এক সময় আপনারা মজলুম ছিলেন, এখন কেন জালিমের পথ বেছে নিতে চাচ্ছেন। আল্লাহ যদি আমাদেরকে সরকার গঠনের তৌফিক দেন, তাদেরকে সংশোধনের জন্য আমরা সুযোগ দেব। যদি তারা সংশোধন না হয়, তাহলে তাদেরকে কঠোর হাতে দমন করা হবে।
শফিকুর রহমান বলেন, সরকারি-বেসরকারি চাকরি যারা করছেন, অনেকেই সম্মানজনক বেতন পাচ্ছেন না। সেই বিষয়গুলো নিয়ে আমরা কাজ করব। সরকারি-বেসরকারি সব কর্মকর্তা-কর্মচারী যেন সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে পারেন, সেই ব্যবস্থা করা হবে।
আমাদের গণজোয়ার দেখে কেউ কেউ মিথ্যা অপবাদ এবং বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, ক্ষমতায় গেলে কওমি মাদ্রাসার আলেমদের সঙ্গে বৈঠক করব। কওমি মাদ্রাসার উন্নয়নের স্বার্থে যা লাগে তাই আমরা করব। আমরা কওমি মাদ্রাসার বিরোধী নই।
তিনি বলেন, যুবসমাজ তাদের অধিকারের জন্য যুদ্ধ করেছে। বলেছে- হয় আমার অধিকার দাও, না হয় আমাকে গুলি দাও। তারা বলেছে- বুকের ভেতরে তুমুল ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর। আমরা সেই জুলাই যোদ্ধাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি। যারা মজলুম হয়ে শহীদ হয়েছেন, যারা অত্যাচারের শিকার হয়েছেন তাদের সবার প্রতি আমরা শ্রদ্ধা এবং সম্মান জ্ঞাপন করছি।
জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহেরের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন- এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক, জামায়াতের নায়েবে আমির মাওলানা আব্দুল হালিম, সহকারী সেক্রেটারি মাওলানা এটিএম মাসুম, ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম, ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদুল ইসলাম।
পরে জামায়াতের আমির কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার নিমসার এবং দাউদকান্দি এলাকায় নির্বাচনি সমাবেশে বক্তব্য দেন।